সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার সদ্য স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক 'মক্কা চুক্তি'-তে বাংলাদেশকে যুক্ত করার যে প্রস্তাব তুর্কি গণমাধ্যমে উঠেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, তুরস্কের এই নতুন কৌশল ভারতের সামরিক ও কৌশলগত বলয়ের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একই সঙ্গে ঢাকা-আঙ্কারা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাব্য এ বিস্তারকে দিল্লির একচ্ছত্র প্রভাব থেকে বাংলাদেশের বের হয়ে আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এনডিটিভিতে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অদিতি ভাদুড়ির লেখা নিবন্ধে বলা হয়, সম্প্রতি তুরস্কের প্রভাবশালী দৈনিক 'ইয়েনি শাফাক'-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, সৌদি-পাক-তুর্কি জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ঢাকাকে "ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক বিষমতা বা অসমতা কাটিয়ে এক পরিপক্ক ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির" দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
নিবন্ধটিতে বলা হয়, 'ইয়েনি শাফাক' কেবল সাধারণ কোনো পত্রিকা নয়, এটি আঙ্কারার বর্তমান ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থী দল ও প্রেসিডেন্ট রজব তইয়্যব এরদোয়ানের বেশ ঘনিষ্ঠ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে সংবাদপত্রটি বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে আসছে এবং ঢাকার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পূর্ণ সমর্থন জোগাচ্ছে।
এনডিটিভির নিবন্ধে শঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, এই চুক্তিটি স্রেফ গণমাধ্যমের খবরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের আদলে বাংলাদেশের সাথেও নিজস্ব প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন ব্লক বা এই ত্রিপক্ষীয় জোটে বাংলাদেশের যোগদানের সুযোগ উম্মুক্ত রাখা হয়েছে বলে আঙ্কারা সংকেত দিয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত একক প্রভাব বজায় রাখতে চাওয়া ভারতের জন্য এই সম্ভাব্য সমীকরণ বেশ অস্বস্তিকর।
নিবন্ধে বলা হয়, আর ঠিক এই জায়গাতেই ভারতের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। 'মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি' তুরস্ককে এক বাড়তি শক্তি জোগাবে, যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য দিন দিন এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
এনডিটিভির নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, 'মক্কা চুক্তি' সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই তুরস্ককে একটি বড় আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করছে। তবে রিয়াদের সাথে দিল্লির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গভীর সম্পর্কের কারণে সৌদি আরব সরাসরি ভারতের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইবে না। রিয়াদ বর্তমানে ভারতীয় অর্থনীতিতে শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে এবং দুই দেশের মধ্যে যৌথ সামরিক মহড়াও চলমান।
সৌদি আরবে অন্তত ৪০টি ভারতীয় কোম্পানি তাদের সদর দফতর বা আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করেছে। তাছাড়া, সৌদি জ্বালানির অন্যতম প্রধান আমদানিকারক হলো ভারত— যা বর্তমানের ইরান সংঘাত এবং সৌদি রফতানির মূল নৌপথগুলোতে ইরানের প্রক্সি হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান অবরোধের মুখে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারত ও সৌদি আরবের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রতিরক্ষা খাত পর্যন্ত বিস্তৃত; দুই দেশই নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে থাকে। তাই সৌদি আরব কখনোই এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলতে চাইবে না, বিশেষ করে পাকিস্তানের জন্য তো নয়ই।
প্রকৃতপক্ষে, গত সেপ্টেম্বরে সৌদি-পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরপরই একজন জ্যেষ্ঠ সৌদি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছিলেন যে, এই চুক্তিটি বহু বছরের আলোচনারই একটি চূড়ান্ত রূপ।
তিনি উল্লেখ করেন, এটি নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা ঘটনাকে লক্ষ্য করে করা হয়নি... ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি মজবুত। আমরা এই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাব এবং যেভাবেই হোক আঞ্চলিক শান্তিতে অবদান রাখার চেষ্টা করব, বলা হয় নিবন্ধে।
কিন্তু ভারতের মূল উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তুরস্ককে নিয়ে। তুর্কি প্রতিরক্ষা শিল্প বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি তৈরি করছে। দেশটির নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান 'কান' এবং সম্প্রতি প্রদর্শিত ৬,০০০ কিলোমিটার পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রোটোটাইপ 'য়িলদিরিমহান' আন্তর্জাতিক বাজারে ঝড় তুলেছে। অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে তুরস্ক এই চুক্তির মাধ্যমে একদিকে যেমন সৌদির বিশাল তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তান ও সম্ভাব্য নতুন অংশীদারদের কাছে নিজেদের ভারী মারণাস্ত্র রফতানির বড় বাজার খুঁজে পাচ্ছে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়, সম্প্রতি ইসরায়েল কেন্দ্রিক 'ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর' (আইএমইসি) থমকে যাওয়ায় তুরস্ক বিকল্প বাণিজ্য রুট হিসেবে নিজ দেশকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। সিরিয়া ও জর্ডান হয়ে তুরস্কের মধ্য দিয়ে এই রুট পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, যা এরদোয়ান প্রশাসনের বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে, ‘বাংলাদেশ যদি সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেয় তবে কী ঘটবে?’- এমন শিরোনামে তুর্কি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'ইয়েনি শাফাক'-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান উদীয়মান প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগদানের একটি কাল্পনিক বা সম্ভাব্য দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে কীভাবে এমন একটি পদক্ষেপ ঢাকার পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের সমীকরণকে নতুন রূপ দিতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ যদি এই জোটে যোগ দেয়, তবে তা একটি পরিপক্ক ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির বার্তা দেবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক অসমতা কাটিয়ে একটি বহুমুখী নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাবে। পাকিস্তান ও তুরস্ক এটিকে ইসলামিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার এক স্বাভাবিক সম্প্রসারণ হিসেবে স্বাগত জানাবে, অন্যদিকে ভারতকে তার পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীর প্রতি ঐতিহ্যগত দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
তুরস্কের উন্নত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামুদ্রিক অভিজ্ঞতার সহায়তায় বাংলাদেশ ভারতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তার নৌবাহিনীকে আধুনিকায়ন করতে পারবে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জ্বালানি সম্পদ এবং বৈশ্বিক শিপিং লেনগুলোর নিরাপত্তা তখন একটি যৌথ দায়িত্বে পরিণত হতে পারে— যা এই অঞ্চলের পূর্ব সামুদ্রিক এলাকায় দিল্লির একক কর্তৃত্ব ভেঙে দিতে সক্ষম।
বাংলাদেশের ৪,০৯৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ স্থল সীমান্তটি আগ্রাসনের কেন্দ্র না হয়ে শান্তির সীমানা হিসেবেই থাকবে। তবে বাংলাদেশ একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হলে নয়াদিল্লি দ্বিপাক্ষিক পানিবণ্টন ও বাণিজ্য বিরোধের মতো ইস্যুগুলোতে আরও বেশি কূটনৈতিক সতর্কতা অবলম্বন করতে বাধ্য হবে। ক্ষমতার ভারসাম্য সূক্ষ্মভাবে ঢাকার দিকে ঝুঁকবে, যা ভারতকে আঞ্চলিক অভিভাবকের বদলে এক সমান অংশীদার হিসেবে আলোচনায় বসতে বাধ্য করবে।
এই চুক্তির মাধ্যমে তুরস্কের ন্যাটো মানের প্রতিরক্ষা শিল্প— বিশেষ করে যুদ্ধে পরীক্ষিত ড্রোন বা ইউএভি প্রযুক্তি সরাসরি বাংলাদেশের হাতের নাগালে চলে আসবে। এটি পাকিস্তানের জন্য তার পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীর সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ তৈরি করবে। ভারত হয়তো প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তনকে অস্বস্তির চোখে দেখবে, তবে ঢাকার জন্য এটি হবে নিজস্ব জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এক অভূতপূর্ব সার্বভৌম আধুনিকায়ন।
ঢাকা এ যাবৎ চীন, ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে দক্ষতার সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখেছে। এই জোটে যোগ দেওয়া কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ হবে না, বরং এটি হবে একটি সুরক্ষাকবচ বা 'হেজ'। তুরস্কের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং সৌদির আর্থিক সক্ষমতা বাংলাদেশকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিকল্প সরবরাহ করবে, যা দেশের বিকাশকে কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশের জিম্মি হওয়া থেকে রক্ষা করবে।
এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মূল কৌশলগত ভিত্তি হলো পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। নয়াদিল্লি 'সম্প্রসারিত প্রতিরক্ষা'র এই ধারণা নিয়ে চিন্তিত হলেও, বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ এর মাধ্যমে এক অতুলনীয় কৌশলগত নিরাপত্তা বলয় পেতে পারে। শক্তির এই নতুন সমীকরণ ভারতকে তার পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীর সাথে একটি সত্যিকারের বহু-মেরুভিত্তিক সম্পর্ক মেনে নিতে বাধ্য করবে, যা একতরফা প্রভাবের বদলে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
ইয়েনি শাফাকের বিশ্লেষণে বলা হয়, বাংলাদেশের এই জোটে যোগদান এখনো একটি সম্ভাব্য ধারণা মাত্র, তবে এটি দেশটির ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মর্যাদার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ। পাকিস্তানের জন্য এটি নিশ্চিত করবে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত গভীরতা এবং তুরস্কের জন্য এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার হৃদয়ে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ। এটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের সবচেয়ে গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত নিয়ন্ত্রণ বা বাধা দেওয়া নয়, বরং মানিয়ে নেওয়া— এটি স্বীকার করে যে এই ব্লকের সাথে ঢাকার অংশীদারিত্ব একটি নতুন বহু-মেরুভিত্তিক আঞ্চলিক ব্যবস্থারই স্বাভাবিক অংশ।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এনডিটিভির এই উদ্বেগের পেছনের মূল কারণ হলো দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর তার একচেটিয়া আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পাওয়া। বাংলাদেশ যদি তুরস্ক এবং সৌদি সমর্থিত কোনো নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হয়, তবে তা দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও স্বীকার করছেন যে, ভৌগোলিক অবস্থান ও নতুন আঞ্চলিক মেরুকরণের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ