ইরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ওমানকে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন তিনি। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হলেও যুদ্ধ অবসানে কোনো চুক্তি হয়নি।
সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, পাঁচ মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরানকে ‘আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা’ তুলতে হবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে তার প্রশাসনের সরাসরি যোগাযোগের একটি গোপন চ্যানেল চালু হয়েছে।
আইআরজিসির কর্মকর্তাদের ‘ভালো পোকার খেলোয়াড়’ হিসেবে বর্ণনা করে ট্রাম্প বলেন, তারা ‘মারা যাচ্ছে’। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার কোনো তাড়া নেই বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমার কোনো সময়সীমা নেই। আমি তাড়াহুড়ো করছি না।’
এদিকে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলছে। প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ইরান নিজস্ব তদারকির ওপর জোর দিচ্ছে। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রণালীতে নতুন একটি নৌপথ চালুর বিষয়ে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছেছে। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানায়, তেহরান ও মাসকাট একটি যৌথ ঘোষণার বিষয়ে কাজ করছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান ও ওমানের স্বার্থ রক্ষা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার চেষ্টা করা হবে।
তিনি বলেন, ‘এই প্রথম এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, যা একই সঙ্গে দুই উপকূলীয় দেশের সার্বভৌম অধিকার রক্ষা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে।’
তবে বাঘাই অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তার দাবি, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অচলাবস্থার কারণ মধ্যস্থতাকারীর অভাব নয়; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের এমন কিছু পদ্ধতির ওপর বারবার নির্ভরতা, যা ‘শত শতবার ব্যর্থ হয়েছে’।
৬০ দিনের সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়াকেও তেমন গুরুত্ব দিতে রাজি নয় ইরান। বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আগেই সমঝোতার শর্ত ব্যাপকভাবে লঙ্ঘন করায় এটি কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে। ফলে ওই সমঝোতার আওতায় কোনো আলোচনা সঠিকভাবে শুরুই হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি শনিবারও বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে তেহরান এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
অন্যদিকে ট্রাম্প শুক্রবার হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডের অংশ ঘোষণা করার কথাও বলেছিলেন। এর জবাবে ইরান জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি নৌপথ ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ব্রায়ান ক্লার্কের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই এমন সব দাবি করছে, যার বাস্তব ভিত্তি সীমিত। তার ভাষায়, দুই দেশ এখন আর প্রকৃত অর্থে আলোচনা করছে না; বরং নিজেদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরে অপর পক্ষকে পিছু হটানোর চেষ্টা করছে।
ক্লার্ক বলেন, ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরও কঠোর করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সুযোগ সীমিত। কারণ এতে মার্কিন বাহিনী বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তার মতে, হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার পথই থাকতে পারে।
তবে এ ধরনের পদক্ষেপে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীকে সরাসরি বাণিজ্যিক জাহাজ রক্ষায় নিয়োজিত করতে হবে, যা এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন এড়িয়ে গেছে।
ক্লার্কের ধারণা, শেষ পর্যন্ত ইরান ও ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণে প্রণালীটি পরিচালিত হতে পারে এবং জাহাজ চলাচলের জন্য কোনো ধরনের ফি নির্ধারণ করা হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি সমাধান খুঁজতে হবে, যা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা হয়েছে বলে দাবি করার সুযোগ দেয়।
সময়ের আলো/কেএইচ