লাতিন আমেরিকার সমুদ্র উপকূলে মাদক পাচারের অভিযোগে সন্দেহভাজন নৌযানে এক বছর ধরে হামলা চালিয়ে শত শত মানুষ হত্যার পর এবার স্থলভাগেও সামরিক অভিযান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ লক্ষ্যে অঞ্চলটির মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েনের পথ তৈরি করছে ট্রাম্প প্রশাসন।
গত সপ্তাহে পানামা সফরের সময় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, কলম্বিয়া, গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাস নিজেদের ভূখণ্ডে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযান চালাতে সম্মত হয়েছে। এর আগে মার্চে ইকুয়েডরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একই ধরনের অভিযান শুরু করে। তবে গুয়াতেমালা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই দাবি অস্বীকার করেছে।
পানামায় একটি সামরিক মহড়ার সময় হেগসেথ বলেন, মাদকবাহী নৌকায় যেভাবে হামলা চালানো হয়েছে, স্থলভাগেও একই ধরনের অভিযান হবে। ইকুয়েডর, কলম্বিয়া ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে কাজ করে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে স্থলভাগে লড়াই চালানো হবে বলে জানান তিনি।
এই উদ্যোগ ট্রাম্প প্রশাসনের লাতিন আমেরিকায় নিরাপত্তা নীতি জোরদার এবং নিজেদের ভাষায় ‘পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার নতুন ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সমালোচকেরা অবশ্য সতর্ক করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বাড়লে বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভও সৃষ্টি হতে পারে।
ইন্টার-আমেরিকান ডায়ালগের লাতিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞ মাইকেল শিফটার বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে মূলত এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক শক্তির ব্যবহারকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তার মতে, এটি সহযোগিতার চেয়ে ক্ষমতার অসম সম্পর্ককেই বেশি প্রকাশ করছে।
লাতিন আমেরিকায় মাদক পাচার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মিত্র দেশগুলোকে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। তবে ২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর অঞ্চলটিতে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হস্তক্ষেপমূলক নীতি নিয়েছে ওয়াশিংটন।
ট্রাম্প প্রশাসন লাতিন আমেরিকার ২০টি অপরাধী গোষ্ঠীকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করতে সেখানে মার্কিন বাহিনী পাঠানো এবং মেক্সিকোয় মাদকবিরোধী অভিযানে সিআইএ কর্মকর্তাদের যুক্ত করার ঘটনাও ঘটেছে।
এ ছাড়া ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৬০টির বেশি নৌযানে মার্কিন হামলায় ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু আসলেই ‘মাদক সন্ত্রাসী’ ছিল কি না, তা নিয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় অভিযানের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এখন স্থানীয় বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি স্থলযুদ্ধে মার্কিন সেনাদের অংশগ্রহণ হলে তা আগের নীতির তুলনায় সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে দেশগুলোর জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং নিজ ভূখণ্ডে মার্কিন সেনার উপস্থিতি নিয়ে পুরোনো স্পর্শকাতরতা আবারও সামনে আসতে পারে।
কলম্বিয়ায় মার্কিন সমর্থিত আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা চলতি মাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশটিতে মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
হেগসেথ জানিয়েছেন, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নিজেই মার্কিন সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন। এমনকি দেশটির প্রধান সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি বা ইএলএনের বিরুদ্ধে হামলায় মার্কিন বাহিনী অংশ নিতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
হেগসেথ বলেন, যেখানে মাদক পাচার হয় কিংবা মার্কিন নাগরিক বা তাদের মিত্রদের জন্য হুমকি তৈরি করা হয়, সেখানেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হবে। এ ক্ষেত্রে মাদক পাচারকারীদের তিনি আইএসআইএস ও আল-কায়েদার মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা করেন।
ইকুয়েডর বর্তমানে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দেশটির জনগণ ২০২৫ সালের এক গণভোটে বিদেশি সামরিক ঘাঁটির বিরোধিতা করলেও মার্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে।
মার্কিন বাহিনীর এক অভিযানে মাদক তৈরির কারখানা ধ্বংসের দাবি করা হলেও নিউইয়র্ক টাইমসের এক তদন্তে দেখা যায়, হামলায় একটি গবাদিপশুর খামার ধ্বংস হয়েছিল।
গুয়াতেমালা এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। দেশটির প্রেসিডেন্ট বার্নার্দো আরেভালো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রাখলেও মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যৌথ মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর বিষয়ে কোনো চুক্তি করার কথা অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের অভিযান বেআইনি হবে।
অন্যদিকে মেক্সিকো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক জোটের বাইরে রয়েছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিলসহ বিভিন্ন মাদক পাচারের বড় উৎস ও ট্রানজিট পয়েন্ট হলেও প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ালেও নিজ ভূখণ্ডে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান চালানোর অনুমতি দিতে রাজি হননি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘যৌথ সামরিক অভিযান’ বলতে প্রতিটি দেশে কী বোঝানো হচ্ছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এমনকি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ডানপন্থী সরকারগুলোর মধ্যেও নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা মোতায়েন নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আরও সামরিকীকৃত এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে সহিংসতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে কলম্বিয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বেসামরিক মানুষের মধ্যে অবস্থান করে এবং অনেক এলাকায় কার্যত স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পালন করে।
ইনসাইট ক্রাইমের সহপরিচালক জেরেমি ম্যাকডারমট বলেন, কলম্বিয়া বা ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বাহিনী ইএলএনের কোনো ঘাঁটিতে হামলা করলে গোষ্ঠীটি তাদের ঘাঁটি গুটিয়ে গ্রাম ও শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততা বাড়লে নিরাপত্তার বিনিময়ে কতটা জাতীয় সার্বভৌমত্ব ছাড়তে জনগণ রাজি, সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে ট্রাম্পের মিত্র সরকারগুলোকেও।
ওয়াশিংটন অফিস অন লাতিন আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অ্যাডাম আইজাকসন বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে জনসমর্থন থাকলেও সরকারগুলো জানে— জনগণের সমর্থন মার্কিন বাহিনীকে কতটা সার্বভৌমত্ব ছাড়ার পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত থাকবে, তারও একটি সীমা আছে।
সময়ের আলো/কেএইচ