গাজায় প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হত্যার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের এই কট্টরপন্থী মন্ত্রী সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় ইসরায়েলি হামলা কমে যাওয়ার সমালোচনা করে এ মন্তব্য করেন।
রোববার প্রকাশ্যে আসা এক সাক্ষাৎকারে সাবেক গাজা জিম্মি রম ব্রাসলাভস্কির পডকাস্টে কথা বলার সময় বেন-গভির এসব মন্তব্য করেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময় তিনি গাজায় সাম্প্রতিক হামলা কমিয়ে আনার বিরোধিতা করেন।
বেন-গভির বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ বিষয়ে তার মতপার্থক্য রয়েছে। তার মতে, গাজায় লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালানো উচিত এবং প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হত্যা করা দরকার।
তিনি আরও বলেন, শুধু তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করা ব্যক্তিদের নয়, গাজায় এমন মানুষও রয়েছেন যারা বেঁচে থাকার যোগ্য নন।
বেন-গভিরের এ ধরনের বক্তব্য এর আগেও ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। তার ও অন্যান্য ইসরায়েলি কর্মকর্তার আগের কিছু বক্তব্য গণহত্যার উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
বেন-গভিরের ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ওপর সরাসরি হামলার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই নেতা বর্তমানে ইসরায়েলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। দেশটির কারাগার ও জাতীয় পুলিশ বাহিনীর ওপর তার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
গাজা ও পশ্চিম তীরের হাজারো ফিলিস্তিনিকে যে কারাগারগুলোতে আটক রাখা হয়েছে, সেগুলোর দায়িত্বও তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এর আগে ফিলিস্তিনি বন্দিদের খাবারের রেশন কমানোর বিষয়েও বেন-গভির প্রকাশ্যে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ২০২৫ সালে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ আদালতও রায় দিয়েছিল, বেন-গভিরের অধীনে কারা কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনি বন্দিদের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খাবার থেকে বঞ্চিত করছে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও এসব হামলায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
তবে সম্প্রতি গাজায় ইসরায়েলি হামলার মাত্রা কমেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন গাজায় হামলা চালানোর অনুমোদন মূলত সেনাবাহিনীর প্রধানের হাতে সীমিত করা হয়েছে। বিষয়টি বেন-গভিরসহ ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিকদের ক্ষুব্ধ করেছে।
একই সাক্ষাৎকারে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে অন্য দেশে চলে যাওয়ারও আহ্বান জানান বেন-গভির। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিকল্পনা জাতিগত নিধনের শামিল হতে পারে।
তিনি বলেন, তিনি পুরো গাজাকেই ইসরায়েলের অংশ হিসেবে দেখতে চান। গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপন, যত বেশি সম্ভব ফিলিস্তিনিকে অন্য দেশে পাঠানো এবং হামাসের যোদ্ধাদের হত্যার পক্ষে অবস্থান জানান তিনি।
প্রায় দুই দশক আগে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি প্রত্যাহার করা হয়েছিল। সে সময় গুশ কাটিফ নামে পরিচিত ২১টি ইহুদি বসতি ভেঙে দেওয়া হয়।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী, হামাস ধীরে ধীরে অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং ইসরায়েল গাজায় হামলা বন্ধ করে সেনা প্রত্যাহার শুরু করবে। হামাস এ প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছে। তবে ভারী অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করেছে তারা।
ইসরায়েলের বর্তমান সরকার ও দেশটির অধিকাংশ রাজনৈতিক দল স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিরোধী। নেতানিয়াহুও বলে আসছেন, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা পুনর্গঠনের মতো যুদ্ধবিরতির অন্যান্য বিষয়ও এখন কার্যত স্থগিত রয়েছে।
সময়ের আলো/ কেএইচ