চলাচলের জন্য বাহন গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। নারী-পুরুষ উভয়েই যাত্রী হিসেবে যেমন বাহন ব্যবহার করতে পারেন, তেমনি চালক হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন। বর্তমান আধুনিক যুগে নারীদের শিক্ষাদীক্ষা, কর্মক্ষেত্র, চিকিৎসা ও পারিবারিক নানা প্রয়োজনে যাতায়াত একটি অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলামি শরিয়তের মূল নীতি ও ইজতিহাদের আলোকেই নারীদের গাড়ি চালানো বা ড্রাইভ করা জায়েজ।
ইসলামের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, শরিয়তের নির্ধারিত বিধিমালা এবং শালীনতা রক্ষা করা হলে নারীর গাড়ি চালাতে কোনো প্রকার বাধা বা নিষেধাজ্ঞা নেই।
ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে নারীদের বাহন চালনার সুনির্দিষ্ট ও ঐতিহাসিক বহু নজির রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রীগণ এবং নারী সাহাবিগণ স্বয়ং উট চালনা করতেন এবং উটের পিঠে চড়ে বিভিন্ন সফর ও যাতায়াত সম্পন্ন করতেন। এ প্রসঙ্গে সহিহ হাদিসে এসেছে, ‘উষ্ট্রারোহী নারীদের মধ্যে কোরাইশের নেক নারীগণই সর্বোত্তম। তারা সন্তানের প্রতি শৈশবে অত্যন্ত স্নেহশীল এবং স্বামীর সম্পদের উত্তম হেফাজতকারী’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।
যেহেতু প্রাক-ইসলামি ও ইসলাম-পরবর্তী যুগে নারীদের বাহন হিসেবে উট বা ঘোড়া চালনার অনুমতি ছিল এবং শরিয়তে এর কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না, তাই সময়ের বিবর্তনে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে আধুনিক গাড়ি চালনাও শরিয়তের এই মৌলিক ইজতিহাদ ও মূলনীতির সরাসরি আওতাভুক্ত। সমসাময়িক কিছু আলেম বর্তমান পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য ফিতনার কথা চিন্তা করে যে সতর্কতা বা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে থাকেন, তা মূলত বিশেষ প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তা সর্বজনীন কোনো শাশ্বত বা চিরন্তন হুকুম নয়।
তবে নারীদের গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তের নির্ধারিত মূল বিধান ও সীমারেখা যেন কোনোভাবেই লঙ্ঘিত না হয়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে-
১. পর্দা ও শালীনতা রক্ষা : গাড়ি চালানোর সময় হিজাব ও শরিয়তসম্মত পর্দার বিধান বজায় রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অশালীন বা আকর্ষক পোশাক পরিধান করে গাড়ি চালানো ইসলামে অনুমোদিত নয়।
২. গায়রে মাহরামের সঙ্গে নির্জনতা বর্জন : গাড়ির ভেতর কোনো গায়রে মাহরাম (যাদের সঙ্গে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী বিয়ে বৈধ) পুরুষ বা ব্যক্তির সঙ্গে যেন কোনো ধরনের নির্জন বা অনুপযুক্ত অবস্থান (খলওয়াত) তৈরি না হয়, সে বিষয়ে কঠোর সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।
৩. দূরপাল্লার সফরে মাহরামের উপস্থিতি : দৈনন্দিন সাধারণ যাতায়াতের ক্ষেত্রে শহর বা লোকালয়ের ভেতরে নারীদের একা গাড়ি চালাতে কোনো বাধা নেই। তবে যাত্রাটি যদি ইসলামি শরিয়ত নির্ধারিত ‘সফর’-এর সীমানায় (প্রায় ৭৭ কিলোমিটার বা ৪৮ মাইল) পৌঁছে যায়, তবে শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী সঙ্গে কোনো মাহরাম অভিভাবক (যেমন স্বামী, পিতা, ভাই বা পুত্র) থাকা জরুরি। মাহরাম অভিভাবক ছাড়া একা ড্রাইভ করে দূরপাল্লার সফর করা ইসলাম সমর্থন করে না।
মোটকথা, শরিয়তের এই সুষম পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ সীমারেখা মেনে চললে আধুনিক যুগে নারীদের গাড়ি চালনায় কোনো ধর্মীয় বাধা নেই এবং এতে ইসলামের অনুশাসন অমান্য হয় না।
সময়ের আলো/মহু