দিবস চলে যায় থেকে যায় মশা

এম মামুন হোসেন

বিবিধ

মশার দাপটে বিপর্যস্ত জনজীবন। প্রতিবছরই মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় লাখো মানুষ। এসব রোগের চিকিৎসা ও মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় হয় হাজার

2026-08-20T00:48:56+00:00
2026-08-20T00:50:06+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬,
৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
বিবিধ
দিবস চলে যায় থেকে যায় মশা
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৪৮ এএম  আপডেট: ২০.০৮.২০২৬ ১২:৫০ এএম
প্রতীকী ছবি
মশার দাপটে বিপর্যস্ত জনজীবন। প্রতিবছরই মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় লাখো মানুষ। এসব রোগের চিকিৎসা ও মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় হয় হাজার কোটি টাকা। তারপরও মশার বিস্তার ঠেকানো যাচ্ছে না। বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, জলাবদ্ধতা ও মানুষের অসচেতনতার কারণে মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ আরও বাড়ছে। 

দেশে মশাবাহিত রোগের মধ্যে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া ও জাপানিজ এনকেফালাইটিস উল্লেখযোগ্য। এসব রোগের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু। চলতি বছরেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এরই মধ্যে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষ।  মশাবাহিত রোগের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে আজ ‘বিশ্ব মশা দিবস’ পালিত হচ্ছে। তবে মশার বিস্তারের বাস্তবতায় বাংলাদেশে দিবসটি অনেকটাই আড়ালে। যে মশা প্রতিবছর মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে, সেই মশা নিয়ন্ত্রণে এখনও কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও খুলনা বিভাগে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সারা দেশে ৭৬ জনের মৃত্যু হলো। তাদের মধ্যে ৪৪ জন নারী ও ৩২ জন পুরুষ। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ২৭২ জনে। একই সময়ে নতুন করে ৬৭১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

১২৩ প্রজাতির মশা : সারা বিশ্বে মশার প্রজাতি রয়েছে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি; যদিও এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি প্রজাতির মশা মানুষকে কামড়ায়। দেশে এ পর্যন্ত ১২৩ প্রজাতির মশা শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ১৪ প্রজাতি। সব মশা মানুষের জন্য সমান ক্ষতিকর নয়। তবে কয়েকটি প্রজাতি বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে মানুষের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

কিউলেক্স মশা সাধারণত মানুষের কাছে সবচেয়ে পরিচিত। শহরাঞ্চলে এটি দৃশ্যত বড় কোনো রোগের কারণ হিসেবে আলোচনায় না থাকলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোদ রোগ ও জাপানিজ এনকেফালাইটিস ছড়ানোর সঙ্গে এ মশার সম্পর্ক রয়েছে।

অ্যানোফিলিস প্রজাতির স্ত্রী মশা ম্যালেরিয়া ছড়ায়। আর ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য দায়ী এডিস মশার দুটি প্রজাতি-এডিস ইজিপ্টি ও অ্যালবোপিকটাস। এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে জমে থাকা অল্প পরিমাণ পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ছাদ ও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি হয়ে উঠছে মশার প্রজননস্থল।

কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা এবং মানুষের অসচেতনতা। ফলে বাংলাদেশে মশার প্রজননের ক্ষেত্র ক্রমেই বাড়ছে।


ডেঙ্গুর দীর্ঘ ইতিহাস : বাংলাদেশে ডেঙ্গু নতুন কোনো রোগ নয়। ১৯৬৪ সালে প্রথম দেশে ডেঙ্গু ভাইরাস ‘ঢাকা ফিভার’ নামে শনাক্ত হয়। পরে ২০০০ সালে প্রথম ডেঙ্গু হিসেবে রোগটি শনাক্ত করা হয়। এরপর প্রায় প্রতিবছরই কমবেশি ডেঙ্গুর সংক্রমণ হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। পরের বছর, ২০২৪ সালে, পরিস্থিতি কিছুটা কমে আসে। তবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ যে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, চলতি বছরের আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা তারই প্রমাণ। শুধু ডেঙ্গু নয়, মশাবাহিত অন্য রোগ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, ফাইলেরিয়া ও জাপানিজ এনকেফালাইটিসের মতো রোগের বিস্তার রোধেও মশা নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।

সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ঘাটতি : বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ শুধু ওষুধ বা কীটনাশক ছিটিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, জনসচেতনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা।

ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এবং হাসপাতালে রোগী ব্যবস্থাপনায় সৃজনশীল উদ্যোগও জরুরি।
মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা চালু, মশারি বিতরণ, মশার ওপর নিয়মিত নজরদারি এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নিয়মিত ও জোরালো তদারকির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো মানুষের আচরণগত পরিবর্তন। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র বা নির্মাণসামগ্রীতে পানি জমে থাকলে তা পরিষ্কার করা এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি।

বিশ্ব মশা দিবস তাই কেবল একটি দিবস পালনের বিষয় নয়। মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং মশা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করারও সুযোগ। প্রতিবছর মশাবাহিত রোগে যখন মানুষ মারা যাচ্ছে, তখন দিবসটি ঘিরে সচেতনতার পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও জোরালো উদ্যোগই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

যে কারণে দিবসটি : ১৮৯৭ সালের ২০ আগস্ট ব্রিটিশ চিকিৎসক রোনাল্ড রস ম্যালেরিয়ার জন্য দায়ী মশার ভূমিকা আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কারের জন্য পরে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। তার সম্মানে যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয়। ১৯৩০ সাল থেকে বিশ্ব মশা দিবস পালিত হয়ে আসছে। পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও দিবসটি পালন শুরু হয়।

বাংলাদেশের মতো মশাবাহিত রোগের উচ্চঝুঁকির দেশে তাই এই দিবসের তাৎপর্য আরও বেশি। মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে শুধু মৌসুমি তৎপরতা নয়, সারা বছর ধরে নিয়মিত নজরদারি ও সমন্বিত কার্যক্রমই পারে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি কমাতে।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে


  বিষয়:   দিবস  মশা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: