ভারত এখনও কৌশলী

এমএকে জিলানী

জাতীয়

‘একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আইনি বিষয় জড়িত। এটি খুবই কাঠামোবদ্ধ। এ বিষয়ে প্রক্রিয়া চলছে এবং আদালতও এতে যুক্ত।

2026-10-04T00:39:54+00:00
2026-10-04T00:39:54+00:00
 
  রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬,
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
ভারত এখনও কৌশলী
এমএকে জিলানী
প্রকাশ: রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৯ এএম 
শেখ হাসিনা। ছবি : সংগৃহীত
‘একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আইনি বিষয় জড়িত। এটি খুবই কাঠামোবদ্ধ। এ বিষয়ে প্রক্রিয়া চলছে এবং আদালতও এতে যুক্ত। তাই কেউ আপনাকে নির্দিষ্ট সময়সীমা বলতে পারবে না।’ 

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত কবে ফেরত দেবে— এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী শনিবার ঢাকায় একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর এক অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এ মন্তব্য করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেখ হাসিনা ইস্যুতে দিল্লি এখনও কৌশল অবলম্বন করছে।

বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের ‘পাওয়ার অ্যান্ড প্রুডেন্স’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনার প্রশ্নোত্তর পর্বে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত ইস্যুতে একজন এ প্রশ্ন করেন। এ সময় ভারতীয় হাইকমিশনার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলেন, আমরা দুপুরের খাবারের পর এই বিষয়ে আলোচনা করতে পারি। তিনি বলেন, ‘অ্যান্ড লাঞ্চ উইল বি এট ইউর হোম।’ এমন সময়ে আরেকজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করেন— ‘দুপুরের খাবারের আগেই জানতে চাই যে খুনি শেখ হাসিনাকে ভারত কবে ফেরত দেবে?’

জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘ভারত সরকার বারবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মাধ্যমে এর উত্তর দিয়েছে। তারা বলেছেন, এটির একটি প্রক্রিয়া রয়েছে এবং প্রক্রিয়াটি আইনি ও এটি সুগঠিত। এই প্রক্রিয়া চলমান। সুতরাং যতদূর জানা গেছে, এতে আদালত জড়িত। ফলে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বলা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যদি অতীত ফিরে দেখি, হাসিনাজিকে আইএএফ (ভারতীয় বিমানবাহিনী) বা ভারতের সেনাবাহিনী নিয়ে আসেনি।

ওই সময় বাংলাদেশের বিয়োগান্তক ঘটনার কারণে তিনি এসেছিলেন। এমন ঘটনা সংঘটিত হওয়া উচিত ছিল না, যেখানে নিরপরাধ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। বাংলাদেশের সামরিক বিমানে তাকে ভারতে নেওয়া হয়েছিল। আমি তখন টেলিভিশনে বিষয়টি দেখছিলাম। তিনি (শেখ হাসিনা) যখন ঢাকা ত্যাগ করেন, তখন তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং ভারত এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমরা যদি তাকে অবতরণের অনুমতি না দিতাম, তবে একদম অন্যরকম এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। ভারত যদি তখন ল্যান্ডিং (বাংলাদেশের সামরিক বিমান) করার অনুমতি না দিত তবে কী ঘটত আমি জানি না। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার পেছনে এটাই ছিল বাস্তবতা।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ, সিদ্ধান্তও তাই স্বাধীনভাবে নেবে, কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক করবে, রাখবে, তা একান্তই এ দেশের মানুষের আর সরকারের সিদ্ধান্ত। সত্যিকারের প্রতিবেশী কোনো অভ‍্যন্তরীণ নীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। পরিবারের মধে‍্য ভুল-বোঝাবুঝি থাকতেই পারে।’

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারত এখনও কৌশল অবলম্বন করছে। এ বিষয়ে দিল্লি ঢাকার কূটনৈতিক পত্রের এখনও কোনো জবাব দেয়নি। বরং তারা বিষয়টি এখনও উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। শুরুতে ভারত শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে বসেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে। এখনও শেখ হাসিনাকে সে সুযোগ দিচ্ছে ভারত। শেখ হাসিনা গত সপ্তাহে দিল্লি থেকে ভার্চুয়ালি লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। 


এরপর গত ২ অক্টোবর তিনি একইভাবে দিল্লি থেকে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট, আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনারে ঢাকার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এর অর্থ ভারত একদিকে বলছে দিল্লি ঢাকার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চায় এবং প্রতিবেশীর অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করে না। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে, যা দ্বিচারিতা। প্রকৃতপক্ষে ভারত এই বিষয়ে এখনও কৌশল অবলম্বন করছে। যার পেছনে রয়েছে ‘হিন্দুভা’ বা অখণ্ড ভারত ষড়যন্ত্র।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারি দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার ঢাকায় বক্তব্য দিয়েছেন, তা হচ্ছে এর আগে একাধিকবার দিল্লির এমইএর (ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) দেওয়া বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি। ভারত যে হাসিনা ইস্যুতে কৌশল অবলম্বন করছে ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে সেটারই প্রতিধ্বনি পাওয়া গেছে। সত্যিকার অর্থে ভারত হাসিনাকে কখনোই ফেরত দেবে না। কেননা হাসিনার সঙ্গেই ভারতের বন্ধুত্ব, যা হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময়ই টের পাওয়া গিয়েছিল। হাসিনা ২০১৮ সালে একবার বলেছিলেন, ভারতকে আমরা যা দিয়েছি, তা তাদের সারাজীবন মনে রাখতে হবে। আসলে ভারত সবসময়ই শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের নিরাপত্তা চায়।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, শনিবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে ইতিহাসের কনটেন্ট হিসেবে এখানে নতুন এলিমেন্ট আছে। ভারতীয় দূতের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এয়ারক্রাফট শেখ হাসিনাকে ভারতে পৌঁছে দেয়। আইনি দৃষ্টিতে এ বক্তব্যকে খণ্ডন করলে দাঁড়ায়, তখন শেখ হাসিনা এজ এ প্রাইম মিনিস্টার (প্রধানমন্ত্রী) হিসেবেই ভারত গেছেন। তাকে বন্দি বলা যাবে না। এ দৃষ্টিতে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি কাজ করবে না। কেননা এই চুক্তি যারা পলাতক বা বন্দি তাদের ক্ষেত্রে কাজ করবে। ভারতীয় হাইকমিশনার সিম্পল জবাব হিসেবে আইনগত বিষয়টা বলতে গিয়ে এটাই বুঝিয়েছেন। কিন্তু ভারতীয় হাইকমিশনারের বার্তা পরিষ্কার, তিনি সরাসরি না হোক পরোক্ষভাবে বার্তা দিচ্ছে— ঢাকা যেভাবে চাচ্ছে সেভাবে দিল্লি শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না। 

ঢাকার সরকারের কাছে বিষয়টি পছন্দনীয় হবে না। ভারত চাচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্কে যেন এই বিষয়টা কাঁটা হয়ে না দাঁড়ায়। ভারত হয়তো বিষয়টি মিনিমাইজ করতে চাচ্ছে এবং প্রত্যর্পণের গুরুত্ব কমাতে চাচ্ছে। অর্থাৎ শেখ হাসিনা ইস্যু বাদ দিয়ে অন্য বিষয়গুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। ভারত এ ক্ষেত্রে কৌশলের অবলম্বন করছে। বাংলাদেশের এখন পাল্টা কৌশল নিতে হবে, যাতে ঢাকার স্বার্থ রক্ষা হয়। কেননা কেউ যদি খেলার নিয়ম বদলে ফেলে তা হলে আপনি তো খেলা ছেড়ে আসতে পারবেন না। খেলার মধ্যে এমন কৌশল নিতে হবে যে ভারত চাল দিলে যেন বাংলাদেশও একটা চাল দিতে পারে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   ভারত  বাংলাদেশ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: