রাতভর রাশিয়ার চালানো একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।
ইউক্রেনের স্টেট ইমার্জেন্সি সার্ভিস (ডিএসএনএস) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের (২০ আগস্ট) এই ব্যাপক হামলায় আবাসিক ভবন ও গুদামঘরগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হামলায় অন্তত ৩৩ জন আহত হয়েছেন।
ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না, তা খুঁজে দেখতে উদ্ধারকর্মীরা অভিযান চালাচ্ছেন। ইতোমধ্যে ধ্বংসস্তূপ থেকে দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে, ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী উত্তরাঞ্চলে একটি ড্রোন রোমানিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করায় দেশটিতে বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়।
রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে একটি ড্রোন দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করে। গালাতি শহরের প্রায় ১৩ কিলোমিটার পূর্বে এটি প্রবেশ করেছিল। পরে ড্রোনটি একটি জনবসতিহীন এলাকায় বিধ্বস্ত হয়ে সামান্য আগুনের সৃষ্টি করে, যা দ্রুত নিভিয়ে ফেলা হয়। ঘটনায় কোনো হতাহত বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের একটি অংশ থাকা পোল্যান্ডের সামরিক বাহিনীও নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষায় “প্রতিরক্ষামূলক বিমান অভিযান” শুরু করার কথা জানিয়েছে।
কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিৎসকো বলেন, রাতের হামলায় একটি শিশু হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতালের জানালার কাচ ভেঙে যায় এবং আশপাশে কয়েকটি গাড়িতে আগুন ধরে যায়।
কিয়েভের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সোলোমিয়ানস্কি জেলায় একটি শিল্পকেন্দ্রেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে বলে জানান মেয়র। কিয়েভ অঞ্চলের ব্রোভারির জেলায় চালানো একটি হামলায় একজন নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক গভর্নর তিমুর তকাচেঙ্কো।
এর আগে রাতেই আঞ্চলিক প্রশাসন বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছিল। পাশাপাশি বলা হয়েছিল, ওই এলাকায় বিমান প্রতিরক্ষা অভিযান চালানো হতে পারে।
রাতভর আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ একাধিকবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা জারি করে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর সতর্কবার্তার বরাত দিয়ে তারা জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রাজধানী কিয়েভের দিকে এগিয়ে আসছে।
রাশিয়ার হামলায় রাতভর কিয়েভ অঞ্চলের হাজার হাজার বাড়ি ও স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে বেশ কিছু এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ অবকাঠামো মেরামতে কর্মীরা দ্রুত কাজ শুরু করেন।
সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে প্রায় প্রতিরাতেই রাশিয়ার হামলার শিকার হচ্ছে কিয়েভ। এসব হামলার কয়েকটিতে কয়েক ডজন মানুষ নিহত ও গুরুতর আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহে দেশটির এক ডজনেরও বেশি অঞ্চলে হামলা হয়েছে। এ সময়ে রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ১,৫৫০টির বেশি আক্রমণকারী ড্রোন, ১,৫৬০টি গাইডেড বোমা এবং ৬২টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে, গত কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনও রাশিয়ার অভ্যন্তরে অনেক দূর পর্যন্ত হামলা জোরদার করেছে। সম্প্রতি মস্কোকে লক্ষ্য করে প্রায় ৬০০টি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এই সপ্তাহে রাশিয়ায় দুটি পৃথক হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন শিশু ছিল।
জুলাই থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজ-এর একটি গুদামকে বারবার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ওয়াইল্ডবেরিজকে রাশিয়ার ‘অ্যামাজন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সর্বশেষ হামলার ফলে ওয়াইল্ডবেরিজের ১০টি বৃহত্তম লজিস্টিকস কেন্দ্রের মধ্যে ৭টি “অচল” হয়ে গেছে।
রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনের এসব হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মস্কোর ওপর চাপ বাড়িয়ে শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য করা এবং সাড়ে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো। তবে যুদ্ধবিরতি নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় এখনো তেমন অগ্রগতি হয়নি।
উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ করে আসছে।
রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে। বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, যার বেশিরভাগই দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী এলাকায়।
সূত্র : বিবিসি
সময়ের আলো/ইউএমএইচ