কৃষিকাজে প্রতিবছরই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন বরিশালের কৃষকরা। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, আগাছা, রোগবালাই এবং বাড়তি শ্রমিকের মজুরি— সব মিলিয়ে অনেক সময়ই কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই প্রতিকূলতা পেরিয়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ‘মালচিং পদ্ধতি’ স্থানীয় কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা, আগাছা দমন, সেচের পানি সাশ্রয় এবং পরিচর্যার শ্রম কমানোর সুবিধার কারণে বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় এই পদ্ধতিতে সবজি ও উচ্চমূল্যের ফসল চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
কৃষি বিভাগ ও মাঠপর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শসা, টমেটো, মরিচ, বেগুন, চিচিঙ্গা, করলা, লাউ ও তরমুজসহ নানা ধরনের সবজি এবং উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনে মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে আগাম সবজি চাষে এটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় এর ব্যবহার দ্রুত প্রসার লাভ করছে।
এই পদ্ধতিতে জমিতে নির্দিষ্ট দূরত্বে বেড তৈরি করে তার ওপর বিশেষ ধরনের মালচিং পেপার বা পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিক শিট বিছিয়ে দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট দূরত্বে ছিদ্র করে চারা রোপণ করা হয়। এতে সূর্যের আলো সরাসরি মাটিতে পৌঁছাতে না পারায় আগাছা জন্মাতে পারে না। পাশাপাশি মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘক্ষণ বজায় থাকে বলে ঘন ঘন সেচ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। মাটির তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা স্থিতিশীল থাকায় ফসলের বৃদ্ধিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
শুরুতে জমি প্রস্তুত ও মালচিং পেপার কিনতে কিছুটা অতিরিক্ত খরচ হলেও, পরবর্তীতে আগাছা পরিষ্কার, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ হ্রাসের পাশাপাশি কৃষকদের পরিচর্যার সময়ও সাশ্রয় হয়।
হিজলা সদর উপজেলার কৃষক আনোয়ার এক একর জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে টমেটো, করলা, বেগুন ও লাউ চাষ করে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন। তার ভাষ্য, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এ পদ্ধতিতে জমির পরিচর্যা অনেক সহজ হয়েছে এবং ফলন ও লাভ দুটোই ভালো পাওয়া যাচ্ছে।
বরিশাল সদর উপজেলার লাকুটিয়া বাজারের ‘আকাইদ অ্যাগ্রো’র মালিক রাকিব হোসেন জানান, এলাকায় মালচিং প্রযুক্তির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ২০ শতক জমিতে প্রায় ৪ ফুট চওড়া ও ১ হাজার ৬৮৫ ফুট লম্বা একটি মালচিং পেপার ব্যবহার করতে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়। প্রাথমিক এই ব্যয় সেচ, সার ও শ্রমের খরচ সাশ্রয়ের মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।
উজিরপুরের কৃষক সুরুজ এবং বাবুগঞ্জের চাঁদপাশার ‘দেলোয়ার অ্যাগ্রো ট্রেনিং সেন্টারে’র সিদ্দিকী সুমন জানান, বরিশালের মতো বৃষ্টিপ্রবণ ও নিচু এলাকায় মাটির আর্দ্রতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। অতিরিক্ত বৃষ্টির পর মাটির গুণগত পরিবেশ ধরে রাখতে এবং বৃষ্টিহীন সময়ে সেচ সংকট কমাতে মালচিং অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ওঠানামা কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই সংকট মোকাবিলায় মালচিংয়ের মতো প্রযুক্তি পানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সাহায্য করছে। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে মানসম্মত মালচিং পেপার ব্যবহার এবং কৃষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মো. মামুনুর রহমান জানান, দক্ষিণাঞ্চলে কতসংখ্যক কৃষক এ পদ্ধতিতে যুক্ত আছেন তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও, মাঠপর্যায়ে এর ব্যবহার যে দ্রুত বাড়ছে তা স্পষ্ট।
উপ-পরিচালক মোসাম্মাৎ মরিয়ম বলেন, বরিশাল নিচু ও বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এখানে মালচিং পদ্ধতির সম্ভাবনা অপার। শীতকালীন ও খরিপ মৌসুমে আগাম সবজি উৎপাদনে এটি অত্যন্ত লাভজনক। মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ, মানসম্মত উপকরণের সহজলভ্যতা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানো গেলে জলবায়ু সহনশীল ও লাভজনক টেকসই কৃষি গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সময়ের আলো/জোই