পদোন্নতির ধীরগতিতে হতাশা বিরাজ করছে পুলিশের উপপরিদর্শকদের (এসআই) মধ্যে। কঠিন পরীক্ষা ও একাধিক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে পদোন্নতির তালিকাভুক্ত (পিএল) হওয়ার পরও পদোন্নতি পাচ্ছেন না অনেক এসআই।
পুলিশে সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থানা পর্যায়ে মামলা তদন্ত, অপরাধী শনাক্তকরণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও মাদকবিরোধী অপারেশন পরিচালনাসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে তারা প্রধান ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু যুগ পেরিয়ে গেলেও একই পদে কাজ করায় কাজে স্থবিরতার কথা জানিয়েছেন পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা উপপরিদর্শকরা। যা তাদের পেশাগত কাজেও প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন তারা।
ডিএমপির বিভিন্ন থানার বেশ কয়েকজন ইন্সপেক্টর ও এসআইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইন্সপেক্টরসিপের প্রতিটি পরীক্ষা খুবই কঠিন। দীর্ঘ ডিউটির পর পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে কঠোর প্ররিশ্রম করতে হয়। এতগুলো ধাপ পার হওয়ার পরও কাক্সিক্ষত পদোন্নতি পেতে অপেক্ষা করতে হয় বছরের পর বছর।
তারা জানান, এসআই থেকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পেতে কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ বছর পেরিয়ে (যদি একবারেই পরীক্ষায় পাশ করে যায়) যায়। তবে সিংহভাগ এসআই একবার সব বিষয়ে পাস করতে পারেন না। এসআই থেকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পেতে গড়ে ১০ থেকে ১২ বছর কিংবা কখনো কখনো আরও বেশি সময় লাগে বলে জানান তারা। এসব ধাপ অতিক্রম করার পর পদোন্নতির তালিকাভুক্ত (পিএল) হওয়ার পরও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় পদোন্নতির জন্য।
পদোন্নতিতে ধীরগতি : ২০২০ সাল থেকে প্রায় তিন হাজার সাব-ইন্সপেক্টর পরীক্ষায় পাস করে পিএলভুক্ত হয়েও পদোন্নতি পাচ্ছেন না। একবার ক্লিয়ারেন্স নিয়ে ৩-৪ মাস ধরে ফাইল আটকে যাচ্ছে। এতে অফিসারদের মনোবলে প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘকাল ধরে পদোন্নতি না পাওয়ায় বেতন-ভাতা, সামাজিক পদমর্যাদা এবং পেশাগত মর্যাদায় পিছিয়ে পড়ছেন তারা, যা পারিবারিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে পদোন্নতির প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সবাই তাদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। এসআই ৩৩তম ব্যাচের (২০১২ সালে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী) একজন এসআই বলেন, পরিবার ও আত্মীয়স্বজনরা পদোন্নতির কথা জিগ্যেস করলে বিব্রত হতে হয়। প্রায় ১৪ বছর ধরে একই পদে কাজ করার ফলে কাজেও স্থবিরতা চলে আসে।
পদোন্নতির তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও পদোন্নতি না পাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেন তিনি। ৩৪ ও ৩৫তম ব্যাচের একাধিক উপপরিদর্শক জানান তাদের হতাশার কথা। তারা বলেন, ১০ থেকে ১২ বছর কাজ করে আমরা যে পোস্টে আছি, সদ্য পাশ করা একজন সাব-ইন্সপেক্টরও আমাদের সঙ্গে একই পোস্টে কাজ করেন; বিষয়টি সিনিয়রদের জন্য বিব্রতকর। এ উপপরিদর্শকরা আরও বলেন, পরীক্ষায় পাশ করে সব ধাপ সম্পন্ন করার পরও পদোন্নতির নিশ্চয়তা থাকে না। মেধা ও সিনিয়রিটির সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়গুলোও পদোন্নতিতে বিবেচনা করা হয়।
ওয়ারী থানার একজন এসআই বলেন, পরিবারে কাছে ছোট হয়ে যাই। আত্মীয়-পরিবারের সদস্যরা সবসময় পদোন্নতির কথা জিজ্ঞেস করে। কিন্তু কোনো উত্তর দিতে পারি না। এক পদে দীর্ঘ সময় কাজ করতে গিয়ে একঘেয়েমি ও কাজে স্থবিরতা চলে আসে। যা অনেক সময় পেশাগত কাজে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, আমরা কার কাছে এসব কথা বলব— সেটিও জানি না। আমাদের নিয়ে যেন কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। তিনি বলেন, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তাকে আর পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হয় না। অথচ সেই অভিযোগটি সঠিক কি না তাও যাচাই করা হয় না।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের একটি থানার ওসি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ইন্সপেক্টর থেকে এএসপি হতে বিভাগীয় ৩৩ শতাংশ কোটা থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না।
শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পদোন্নতির বিষয়ে অনেক উপপরিদর্শক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখালেও মূলত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই পদোন্নতি হচ্ছে। যোগ্যদেরই পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। অনেক এসআই ইন্সপেক্টরসিপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন না। একাধিকবার তাদের পরীক্ষায় বসতে হয়। এতে দীর্ঘ সময় লাগে। তবে নতুন পদ সৃষ্টি না হওয়াটাকে পদোন্নতির ধীরগতির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, ইন্সপেক্টর থেকে এএসপি পদোন্নতি ত্বরান্বিত হলে, ইন্সপেক্টরের পদ বৃদ্ধি করা হলে উপপরিদর্শক থেকে পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পদে পদোন্নতিও ত্বরান্বিত হবে।
হতাশা ও বৈষম্যের কথা জানা যায় অন্য ক্ষেত্রেও। পুলিশের মধ্যে যারা কনস্টেবল থেকে পদোন্নতি পেয়ে এসআই হন, তাদের সরাসরি এসআই পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা একটু ভিন্ন চোখে দেখেন। আবার এসআই থেকে যারা এএসপি বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা হন, তারা প্রাপ্য মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংকটের কারণ : চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট মেয়াদে পদোন্নতির সুযোগ থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পদ সৃষ্টির ধীরগতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে এক পদেই থমকে আছেন শত শত কর্মকর্তা। সমসাময়িক অন্যান্য বিভাগ বা ক্যাডারের পদে পদোন্নতির গতি স্বাভাবিক থাকলেও পুলিশের এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরে পদোন্নতির সূচক অত্যন্ত মন্থর।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, ইন্সপেক্টর থেকে এএসপি পদে পদোন্নতিতে বিভাগীয় ৩৩ ভাগ কোটা বরাদ্দ আছে। আমরা এটিকে ৫০ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছি। ইন্সপেক্টর থেকে এএসপিতে পদোন্নতি ত্বরান্বিত হলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও পদোন্নতি সংক্রান্ত সব জট খুলে যাবে।
পদোন্নতির ধাপ : একজন এসআই প্রশিক্ষণ সমাপ্তি শেষে কাজে যোগদানের পাঁচ বছর পর ইন্সপেক্টরসিপ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। বুক (বই দেখে), নন-বুক (বই না দেখে) এবং ক্রিমোনলজি এই তিনটি বিষয়ে ২০০ নম্বর করে ৬০০ নম্বর পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। পুলিশি আইন ও বিধি, ফৌজদারি আইন ও কার্যবিধি, তদন্তসংক্রান্ত বিষয়, পুলিশ রেগুলেশন ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান এবং ব্যবহারিক পুলিশিং জ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে এসব লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তিনটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিআইসি এবং ডিটিএস প্রশিক্ষণ কমপ্লিট করতে হয়। এরপর বিভাগীয় পরীক্ষা ও অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করার পর যোগ্য এসআইদের রেঞ্জভিত্তিক তালিকায় (আরএল) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রেঞ্জে তালিকাভুক্তির জন্য সন্তোষজনক বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন (এসিআর) যাচাই করা হয়। এরপর প্রমোশন লিস্ট (পিএল) বা পদোন্নতি তালিকাভুক্ত হন এবং তাদের সার্ভিস বুক ও প্রশাসনিক রেকর্ডও যাচাই-বাছাই করে যোগ্যতার ভিত্তিতে মেধা তালিকা তৈরি করা হয়। পিএলে অন্তর্ভুক্তির জন্যও এসিআর যাচাই করা হয়। জানা যায়, এসআই পদে ৪৩তম ক্যাডেটদের বর্তমানে প্রশিক্ষণ চলছে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে।
এক বছরে ৬৬৫ পদোন্নতি : গত প্রায় এক বছরে চার ধাপে বাংলাদেশ পুলিশের ৬৬৫ জন সাব-ইন্সপেক্টরকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। সবশেষ গত ৯ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এসআই থেকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় ১৫৩ কর্মকর্তাকে।
২০২৫ সালের ১৮ মার্চ পদোন্নতি দেওয়া হয় ১২৯ কর্মকর্তাকে। ১৭ জুলাই পদোন্নতি দেওয়া হয় ১১০ জনকে এবং ৩ নভেম্বর ২৭৩ জন এসআইকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
পদোন্নতি বাড়াতে থানাগুলোতে ইন্সপেক্টরের পদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগে ইন্সপেক্টর (ওসি) এবং ইন্সপেক্টর (তদন্ত) ছিল। গত কয়েক বছর ধরে ইন্সপেক্টর (অপারেশন) যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে সরাসরি নিয়োগযোগ্য সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) পদের সংখ্যা ১০ হাজার ৫৭৪টি। প্রচলিত বিধি অনুযায়ী মঞ্জুরিকৃত সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) পদে ৫০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে ও ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ হয়ে থাকে।
তবে বাংলাদেশ পুলিশে প্রথমবারের মতো ৪ হাজার উপপরিদর্শক পদে সরাসরি নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ৮৩ বছর আগের পুলিশ রেগুলেশন্স অব বেঙ্গলের (পিআরবি) অধিকতর সংশোধন চেয়েছে পুলিশ সদর দফতর।
বাংলাদেশ পুলিশের আধুনিকায়ন ও মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কাজের গতি এবং মনোবল ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে পদোন্নতির জট খোলা প্রয়োজন। এ বিষয়ে নতুন পদ সৃষ্টি বা শূন্য পদে দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্রপতি, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও মন্ত্রী এবং আইজিপির জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা