আমন রোপণের ভরা মৌসুমে একদিকে জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণের ব্যস্ততা, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহে হন্যে হয়ে ছুটছেন কৃষক। সরকার নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে ঘুরতে হচ্ছে দোকানে দোকানে, আবার কোথাও বাড়তি টাকা দিয়েও মিলছে না প্রয়োজনীয় সার। সারের দাবিতে লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে। তবে সরকারের দাবি, দেশে সারের কোনো সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। মাঠের এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সার-কারখানাগুলোর উৎপাদন পরিস্থিতি। গ্যাস, যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামাল সংকটে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন সাতটি সার-কারখানার ছয়টিই বর্তমানে বন্ধ। চালু রয়েছে শুধু ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি। ফলে আমনের পরপরই শুরু হতে যাওয়া রবি ও বোরো মৌসুমে সার সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল), যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল), আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি (এএফসিএল), ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) এবং শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি (এসএফসিএল)। শুধু ঘোড়াশাল পলাশ কারখানায় উৎপাদন চলছে। বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্য) মো. মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, সাতটি কারখানার মধ্যে ছয়টি বন্ধ থাকলেও দুয়েক দিনের মধ্যে শাহজালাল সার-কারখানা উৎপাদনে যাওয়ার কথা। আমন মৌসুমে সারের ঘাটতি হবে না দাবি করে তিনি বলেন, কাতার ও সৌদি আরব থেকে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে সার আনা হচ্ছে। রাশিয়া ও ব্রুনাই থেকেও সার আমদানির আলোচনা চলছে।
বিসিআইসির সাতটি কারখানার সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ১০০ টন। এর বড় অংশই ইউরিয়া। প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ টন ইউরিয়া দৈনিক উৎপাদনে সক্ষম সিইউএফএল গ্যাস সংকটে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ। আগামী মাসের প্রথম দিকে উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জেএফসিএলও গ্যাসের অভাবে ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ। এর আগে তিন মাস চালু থাকার পর প্রায় এক বছর বন্ধ ছিল কারখানাটি। এখানে দৈনিক ১২০০ থেকে ১৩০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। আশুগঞ্জ সার-কারখানাও গ্যাসের অভাবে গত বছরের ১ মার্চ থেকে বন্ধ। কারখানাটিতে দৈনিক প্রায় ১১০০ টন সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
অন্যদিকে কাঁচামালের সংকটে গত বছরের নভেম্বর থেকে বন্ধ টিএসপি কারখানা। এখানে দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টন টিএসপি সার উৎপাদিত হয়। কারখানাটির জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) রোকন উদ্দিন সামস জানান, কবে উৎপাদন শুরু হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় একমাত্র সচল ঘোড়াশাল পলাশ সার-কারখানায় দৈনিক ২৮০০ টনের বেশি সার উৎপাদন হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ইউরিয়া মজুদ রয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার টন। অথচ আসন্ন রবি মৌসুমে চাহিদা ১৩ লাখ ২৬ হাজার টন। ডিএপি মজুদ ৩ লাখ ৫২ হাজার টনের বিপরীতে চাহিদা ৯ লাখ ৮৮ হাজার টন। টিএসপি রয়েছে ৩ লাখ ৬৮ হাজার টন, চাহিদা ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন। এমওপি মজুদ ১ লাখ ৮১ হাজার টন, বিপরীতে চাহিদা ৫ লাখ ৯৮ হাজার টন। অর্থাৎ শুধু মজুদের হিসাবে রবি মৌসুমের চাহিদার সঙ্গে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, চলতি মাসেই কানাডা, রাশিয়া ও মরক্কো থেকে নতুন চালানের সার দেশে আসবে। এতে মৌসুম শুরুর আগেই চাহিদার তুলনায় বাড়তি মজুদ তৈরি হবে।
বিএডিসির তথ্যেও নন-ইউরিয়া সারের মজুদ নিয়ে উদ্বেগের কারণ রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে ডিএপি মজুদ প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার টন, যেখানে নিরাপদ মজুদ প্রয়োজন ৫ লাখ টন। টিএসপি মজুদ ৩ লাখ ৫৩ হাজার টনের বিপরীতে প্রয়োজন ৪ লাখ টন এবং এমওপি মজুদ ১ লাখ ৯৬ হাজার টনের বিপরীতে প্রয়োজন ৩ লাখ টন। সারের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে গত ২৬ জুলাই কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেয় বিএডিসি। সংস্থাটি জানায়, অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চুক্তিবদ্ধ চালানের পাশাপাশি আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মাসে অতিরিক্ত দুই লট ডিএপি আমদানি করা জরুরি। তবে বেসরকারি আমদানিকারকদের দাবি, সার আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ক্রয়-সংক্রান্ত পরিপত্র এখনও জারি হয়নি। পরিপত্র জারির পর এলসি খোলা এবং জাহাজে সার দেশে পৌঁছাতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। ফলে এখন সিদ্ধান্ত নিলেও নতুন সার দেশে আসতে অক্টোবর-নভেম্বর হয়ে যেতে পারে। এতে রবি মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের মোট চাহিদা প্রায় ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টন। এর মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা ২৬ লাখ ২২ হাজার টন, টিএসপি ৯ লাখ টনের বেশি, ডিএপি প্রায় ১৩ লাখ ৫৫ হাজার টন এবং এমওপি প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার টন। এর বিপরীতে বর্তমানে মোট মজুদ প্রায় ১৬ লাখ টনের কাছাকাছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম জানান, চলতি মৌসুমে রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৭ লাখ হেক্টর। আমন চাষের পাশাপাশি সামনের রবি মৌসুমে সারের চাহিদা আরও বাড়বে।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক সার ব্যবস্থাপনার বর্তমান নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, আগের ভারসাম্যপূর্ণ সার নীতিমালা পরিবর্তন করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যে নীতিমালা করা হয়েছিল, তা সঠিক ছিল না। বর্তমান সরকারও একই জটিল পথে হাঁটছে। তার মতে, বিএডিসির ওপর বিপুল ব্যাংকঋণ, ব্যাংকের এলসি দিতে অনীহা এবং গুদাম সক্ষমতার ঘাটতি সার আমদানিতে বড় বাধা। সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে বাজার মনিটরিং ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দাবি করেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সার মজুদ রয়েছে। তার ভাষায়, যারা কৃত্রিম সংকটের কথা বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা