চেম্বার ছেড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বাস্থ্যসেবা

সময়ের আলো ডেস্ক

প্রযুক্তি

উদ্বেগ, এডিএইচডি কিংবা ট্রমা নিয়ে টিকটক বা ইনস্টাগ্রামে খোঁজ করলেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সামনে হাজির হচ্ছে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ

2026-08-22T01:18:42+00:00
2026-08-22T01:18:49+00:00
 
  শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬,
৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
প্রযুক্তি
চেম্বার ছেড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বাস্থ্যসেবা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ১:১৮ এএম  আপডেট: ২২.০৮.২০২৬ ১:১৮ এএম
সংগৃহীত ছবি
উদ্বেগ, এডিএইচডি কিংবা ট্রমা নিয়ে টিকটক বা ইনস্টাগ্রামে খোঁজ করলেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সামনে হাজির হচ্ছে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের নানা ভিডিও। সহজ ভাষায় তারা ব্যাখ্যা করছেন জটিল মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়, ভাঙছেন প্রচলিত ভুল ধারণা এবং দিচ্ছেন নানা ব্যবহারিক পরামর্শ। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগত চেম্বার, অনলাইন কোর্স, বই কিংবা অন্যান্য পেশাগত সেবার দিকেও অনুসারীদের নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতামূলক কনটেন্ট এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্যতম দৃশ্যমান একটি অংশ। এসব কনটেন্টের দর্শকসংখ্যা কখনো কখনো লাখ ছাড়িয়ে কোটি পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।

বিশ্বজুড়েই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসার ব্যয়, সামাজিক সংকোচ বা স্টিগমা এবং প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর স্বল্পতা সবমিলিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ দেশে প্রতি দুই লাখ মানুষের জন্য মাত্র একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষের মাত্র ৯ শতাংশ পর্যাপ্ত চিকিৎসা পান। 

এমনকি যুক্তরাজ্যেও এডিএইচডি শনাক্তকরণ পরীক্ষার জন্য অপেক্ষার তালিকাও অনেক ক্ষেত্রে কয়েক বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের কাছে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার একটি সহজ ও দ্রুত মাধ্যম হয়ে উঠেছে। টিকটকে অ্যাঞ্জাইটি হ্যাশট্যাগের ভিউ ২০২১ সালের শেষ দিকে প্রায় ৬ বিলিয়ন থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬.১ বিলিয়নে। 

একইভাবে মেন্টালহেলথ হ্যাশট্যাগের ভিউ ২০২২ সালের মার্চে ২৫.৩ বিলিয়ন থেকে ২০২৩ সালের আগস্টে ১০০ বিলিয়নের বেশি হয়ে যায়। অবশ্য এসব সংখ্যা পুরো মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কনটেন্টের পরিমাণ বোঝায় না, নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগের ব্যবহারই এতে গণনা করা হয়।

মানুষ কেন এসব কনটেন্টের দিকে ঝুঁকছে, তার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কেটি রোজ সন্ডার্স ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালের বিভিন্ন সময়ে টিকটকের মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ব্যবহারকারীরা সেখানে সহমর্মিতা ও সমর্থন খুঁজছেন, নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে অন্যদের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজছেন এবং সাহায্যের পথও খুঁজছেন। কেউ কেউ আত্মনির্ণয় বা সেলফ ডায়াগনোসিস নিয়ে আলোচনা করছেন, আবার কেউ এর বিরোধিতা করছেন।

ডিজিটাল বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসক জনাগান আলাগারাজাহর মতে, তরুণবান্ধব ভাষা, সহমর্মী অনলাইন কমিউনিটি এবং পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অনেকের কাছে প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার তুলনায় নিরাপদ ও সহজলভ্য মনে করাতে পারে। বিশেষ করে যারা একাকিত্ব বা বিচ্ছিন্নতায় ভুগছেন, তাদের কাছে অনলাইন কমিউনিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্য পাওয়া আর চিকিৎসা নেওয়া এক বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মানুষ কোনো সমস্যার লক্ষণ সম্পর্কে জানতে পারে, নিজের অভিজ্ঞতাকে বোঝার ভাষা পেতে পারে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার পথ খুঁজে নিতে পারে। কিন্তু প্রকৃত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিভিত্তিক মূল্যায়ন, বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি এবং যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি বড় সুবিধা হলো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ কমানো। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রবার্ট রুপা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেশাজীবীদের প্রচলিত বই বা একাডেমিক নিবন্ধের সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দিয়েছে। তার মতে, এটি অনেক ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানের জ্ঞানকে আরও গণমুখী করেছে। মানুষ কোথায় বাস করে বা থেরাপি নেওয়ার সামর্থ্য তার আছে কি না, তার ওপর তথ্য পাওয়ার সুযোগ নির্ভর করছে না।

তবে এর সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন কিছু সমস্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীরা অনেক সময় চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত বার্তায় নিজেদের গুরুতর মানসিক সংকটের কথা জানান কিংবা ব্যক্তিগত চিকিৎসা-পরামর্শ চান। কিন্তু একজন চিকিৎসকের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অচেনা অনুসারীকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন বা চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। ফলে চিকিৎসক ও অনুসারীর সম্পর্কের সীমারেখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে আরও স্পষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে।

আবার জনপ্রিয়তা যে দক্ষতা বা বিশেষজ্ঞতার প্রমাণ নয় এ বিষয়েও সতর্ক করছেন মনোবিজ্ঞানী জোনাথন শেডলার। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন ব্যক্তির দৃশ্যমানতা অনেক সময় মানুষের কাছে তার জ্ঞান ও যোগ্যতার বিকল্প প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ বিপুলসংখ্যক অনুসারী থাকা মানেই একজন ব্যক্তি বেশি দক্ষ চিকিৎসক এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। জনপ্রিয় হওয়ার আকাক্সক্ষা কখনো কখনো পেশাগত দায়িত্ববোধকেও প্রভাবিত করতে পারে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ গোরকেম ইলমাজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই জনপ্রিয়তাকে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখেন। তার মতে, অনলাইনে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্যের প্রবেশাধিকার বাড়লেও সেটিকে সরাসরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ‘গণতন্ত্রীকরণ’ বলা যায় না। কারণ বিশেষজ্ঞের কর্তৃত্ব অনলাইন জগতে বিলীন হয় না, বরং তার রূপ বদলে যায়। যোগ্যতা ও একাডেমিক পরিচয়ের পাশাপাশি অনুসারীর সংখ্যা, দৃশ্যমানতা এবং ব্যক্তির অনলাইন উপস্থিতির ধরনও মানুষের আস্থার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা তৈরি করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম। মানুষের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা বাড়ায় এমন কনটেন্টই সাধারণত বেশি ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্যের পাশাপাশি ভুল তথ্য, অতিরঞ্জিত দাবি এবং ক্ষতিকর সেলফ ডায়াগনোসিসও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই ধরনের মতামত বারবার সামনে আসায় ব্যবহারকারীরা এক ধরনের ইকো চেম্বারের মধ্যেও আটকে যেতে পারেন।

মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কনটেন্টের বাণিজ্যিকীকরণও একটি জটিল প্রশ্ন। বিনামূল্যের কনটেন্টের মাধ্যমে একজন চিকিৎসক প্রথমে মানুষের আস্থা ও পরিচিতি অর্জন করতে পারেন, পরে সেই পরিচিতি থেকে ব্যক্তিগত চিকিৎসা, কোর্স, বই বা অন্যান্য অর্থপ্রদানের সেবা তৈরি হতে পারে। তবে শুধু অর্থ উপার্জন করাই নৈতিকতার সীমারেখা নয়। চিকিৎসকরা বহুদিন ধরেই বই লিখে বা বক্তৃতা দিয়ে আয় করেন। আসল প্রশ্ন হলো তথ্যটি কতটা নির্ভুল, দায়িত্বশীল ও নিরাপদ এবং তা মানুষকে সঠিক চিকিৎসার দিকে নিয়ে যাচ্ছে কি না।

সবমিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে দেখা না গেলেও এটি এর একটি কম খরচের সম্প্রসারিত অংশ হয়ে উঠতে পারে। সচেতনতা তৈরি, সামাজিক সংকোচ কমানো, অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভাষা খুঁজে পাওয়া, পারস্পরিক সমর্থন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পথ দেখানোর ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা বড়। 

কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অনলাইন তথ্য হতে হবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক, দায়িত্বশীল এবং যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘ছোট দরজা’ দিয়ে কেউ যখন সাহায্য চাইতে এগিয়ে আসবেন, সেই দরজার ওপারে যেন সত্যিকারের নিরাপদ ও যোগ্য চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পথও খোলা থাকে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   চেম্বার  সোশ্যাল মিডিয়া  স্বাস্থ্যসেবা 


Loading...
Loading...
প্রযুক্তি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: