শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত করে তোলা এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করার অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এক বিচার। মামলায় মেটা হেরে গেলে শিশু-কিশোরদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নকশা, বিভিন্ন ফিচার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের চাপ তৈরি হতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে শুরু হওয়া এই মামলায় মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে ২৯টি অঙ্গরাজ্য ও তাদের অ্যাটর্নি জেনারেল। তবে চলমান মূল বিচারে অংশ নিচ্ছে ৪ অঙ্গরাজ্য-ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সি। এটি ২০২৩ সালে করা বৃহত্তর একটি ফেডারেল মামলার অংশ।
অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, শিশু ও কিশোরদের দীর্ঘ সময় ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ধরে রাখতে মেটা এমন কিছু ফিচার ব্যবহার করেছে, যেগুলো ব্যবহারকারীদের বারবার প্ল্যাটফর্মে ফিরতে উৎসাহিত করে। এর মধ্যে রয়েছে অসীম স্ক্রলিং, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও চালু হওয়া, অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কনটেন্ট সুপারিশ এবং ঘন ঘন নোটিফিকেশন।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব ফিচারের নকশা তরুণদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। পাশাপাশি ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের যথাযথ অভিভাবকীয় সম্মতি ছাড়া তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখা এবং অনলাইন গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের বিষয়টিও মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে, মেটা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, তরুণ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আসছে।
মামলায় মেটার বিরুদ্ধে রায় গেলে শিশু-কিশোরদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারপ্রক্রিয়ায় বেশ কিছু পরিবর্তনের চাপ তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে বয়স যাচাই আরও কঠোর করা, কনটেন্ট সুপারিশের অ্যালগরিদম পরিবর্তন, আসক্তি বাড়াতে পারে এমন ফিচার সীমিত করা এবং শিশুদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার মতো পদক্ষেপ থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিরাপত্তা নিয়ে চলমান অন্যান্য মামলাতেও একই ধরনের পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। কার্যকর বয়স যাচাই, শিশুদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ কনটেন্ট সুপারিশ, প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যোগাযোগ সীমিত করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো ব্যবস্থার কথাও আলোচনায় এসেছে।
ফলে, মেটার বিরুদ্ধে রায় গেলে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি শিশুদের কাছে কোন কনটেন্ট কীভাবে পৌঁছাবে, কত ঘন ঘন নোটিফিকেশন যাবে কিংবা ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে রাখার জন্য কোন কোন ফিচার ব্যবহার করা হবে- এসব ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে।
মেটা একই ধরনের অভিযোগে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বড় আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত মার্চে নিউ মেক্সিকোর একটি জুরি মেটাকে রাজ্যের ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করে এবং ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার নির্দেশ দেয়। মামলার পরবর্তী পর্যায়ে আদালত আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের সুরক্ষায় বিভিন্ন সংস্কারের নির্দেশ দেয়। সব মিলিয়ে ওই মামলায় মেটার দায় দাঁড়ায় ৯৪২ মিলিয়ন ডলারে। মেটা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে।
আদালতের নির্দেশিত সংস্কারের মধ্যে আসক্তিমূলক ফিচার কমানো, বয়স যাচাই জোরদার করা এবং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ রয়েছে।
এর বাইরে চলতি বছরের মার্চে ক্যালিফোর্নিয়ার আরেক মামলায়ও মেটা ও গুগলের বিরুদ্ধে রায় আসে। দীর্ঘদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়েছে- এমন অভিযোগ করা এক তরুণীর পক্ষে জুরি ৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে।
শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে আইনি লড়াই চলছে, তার মধ্যে মেটার বিরুদ্ধে বর্তমান মামলাটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
মেটার বিরুদ্ধে রায় হলে যেসব পরিবর্তন আসবে, তার প্রভাব শুধু মেটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনা করা অন্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও তাদের প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা ও নকশা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে। ফলে, এই মামলার রায় যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
সময়ের আলো/মহু