‘দুর্ঘটনার ৪ দিন হাসপাতালে দৌড়াদৌড়িতে হাতে থাকা সব টাকাপয়সা খরচ হয়ে গেছে। দুর্ঘটনার পর থেকে আমরা কোনো সহায়তা পাইনি। মালিকপক্ষের কোনো লোকজন আমাদের দেখতেও আসেনি। এমনকি বকেয়া বেতনটুকুও পাওয়া যায়নি।’ এই অসহায়ত্বের কথা জানান সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ড দুর্ঘটনায় অসুস্থ হয়ে পড়া শ্রমিক দীপু দাশের স্ত্রী।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসের গ্রাসে প্রাণ হারান ১০ জন শ্রমিক। সেই ভয়াবহ মৃত্যুর মিছিলে দীপুও ছিলেন ভেতরে। সেদিন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দীপু যেভাবে প্রাণপণে চিৎকার করেছিলেন-‘এখানে অনেক লোক মারা গেছে, সবাই দ্রুত আসেন’-সেটি আজ কেবল একটি আর্তনাদ নয়, বরং আমাদের শিল্পখাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নির্মম দলিল।
দীপুর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্ঘটনার দিন সকালে মোট ৭ জন শ্রমিক জাহাজটির ভেতরে কাজ করতে ঢোকেন। দলের বাইরে ফোরম্যান ও সেফটি অফিসারসহ ছিলেন আরও ৫ জন।
তিনি জানান, তারা তিন ভাগে কাজ করছিলেন। ২ নম্বর ট্যাংকের পানি বের করতে গিয়ে প্রথমে বিপদে পড়েন নাসির ওস্তাদ ও তার ভাই মনসুর ফোরম্যান। ছিদ্রের মুখ খুলতেই নাসির অচেতন হয়ে নিচে পড়ে যান এবং ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে মনসুরও লুটিয়ে পড়েন। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সানি দাশকে পড়তে দেখে দীপুর ওস্তাদ পলাশ তাকে ধরতে যান, পেছন পেছন যান দীপুও। ঠিক তখনই নাকে আসে সেই বিদঘুটে গন্ধ, মাথা ঝিম ধরে যায়। বুঝতে পেরে আর সামনে না গিয়ে দীপু ওপরে উঠে চিৎকার শুরু করেন। তার ডাকে আশপাশের লোকজন ও অন্য জাহাজ থেকে শ্রমিকেরা ছুটে এলেও ততক্ষণে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে।
দীপু আরও জানান, যে ট্যাংকটি কাটা হচ্ছিল, সেটি ছিল ২ নম্বর ট্যাংক। এর আগে, ১ নম্বর ট্যাংকের দুই-তৃতীয়াংশ কাটা শেষ হয়েছিল। ঠিক এক মাস আগে ওই ট্যাংক কাটার সময়ই গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে সুলতানসহ ৩ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অর্থাৎ, বারবার সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ কোনো স্থায়ী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়নি।
এদিকে, হাসপাতালের চার দিনের দৌড়াদৌড়িতে দীপুর পরিবারের সব জমানো টাকা শেষ হয়ে গেছে। সোমবার হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও শরীর ও মনের ধকল কাটেনি তার। সেলুনের দোকান ছেড়ে এই পেশায় আসা দীপুর সংসারে এখন চরম অনিশ্চয়তা। চিকিৎসক ডাবসহ বিভিন্ন পথ্য খাওয়ার পরামর্শ দিলেও টাকার অভাবে তা কিনতে পারছেন না।
চোখ বন্ধ করলেই এখনো দীপুর নাকে আসে সেই বিদঘুট গন্ধ। চোখের সামনে একের পর এক সহকর্মীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে যাওয়ার বিভীষিকাময় দৃশ্য। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে সীতাকুণ্ডের টিনশেডের ছোট্ট ঘরে শুয়ে থাকা ৩২ বছরের দীপু দাশের চোখে এখন শুধুই শূন্যতা।
প্রতিবেশী নাসির, মনসুর, সানি এবং ওস্তাদ পলাশকে হারিয়ে দীপুর পরিবারসহ পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহত ও আহত শ্রমিকদের বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আহত ও নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ এবং বকেয়া বেতন পরিশোধের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সময়ের আলো/মহু