মন্দা ও মূল্যস্ফীতির চাপে বেসরকারি খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্যের ঊর্ধ্বমুখী চাপ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের আশঙ্কাজনক ধীরগতি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঢাকা

2026-08-23T04:55:15+00:00
2026-08-23T04:55:15+00:00
 
  রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬,
৮ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
অর্থনীতি
মন্দা ও মূল্যস্ফীতির চাপে বেসরকারি খাত
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৫৫ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্যের ঊর্ধ্বমুখী চাপ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের আশঙ্কাজনক ধীরগতি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশে পৌঁছালেও বেসরকারি খাতে তা মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। 

বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত বড় একটি বাধা ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। একই সময়ে দেশের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে অবস্থান করা এবং দারিদ্র্যের হার সাড়ে ২১ শতাংশে পৌঁছানোয় অর্থনীতির ওপর বহুমুখী চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার ও ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

মতিঝিলের ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে শনিবার ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বিবার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি : প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। এ সময় দেশের ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিনিধিরা দেশের বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, রাজস্ব ও মুদ্রানীতির প্রভাব এবং বেসরকারি খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও উত্তরণের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ জানান, ২০২৪ সালের লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশে। দেশের মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের জুনে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থাকলেও জুলাইয়ে তা কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, সরবরাহ চেইনের চরম বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক ফ্রেইট চার্জ দ্বিগুণ হওয়ার কারণে আমদানিকৃত পণ্যের ব্যয় অত্যধিক বেড়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে, যা বাংলাদেশের পণ্যের বৈশ্বিক শিল্প সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সামাজিক ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে ডিসিসিআই জানায়, দেশের দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে সাড়ে ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের সার্বিক প্রভাবে প্রায় ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রজেকশন করা হলেও বৈশ্বিক মন্দাবস্থা ও উচ্চ আমদানি ব্যয় দেশের অর্থনীতিকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করছে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণের প্রসঙ্গে জানানো হয়, ২০২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য সহযোগীকরণে কিছু ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নতুন কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনের সুবিধা, বাংলাদেশ ব্যাংকের আগাম অনুমোদন ছাড়াই ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্জিত মুনাফা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সুযোগ এবং রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে ১০টি নতুন খাতের জন্য শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধা প্রদান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 


এ ছাড়া বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠনে ১২৫টি সেবাকে ২৮টি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে অনলাইনে নিয়ে আসার জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে। এমনকি চামড়া, জুতা, চাল ও হোম টেক্সটাইল খাতে বন্ড সুবিধা তিন বছর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

সরকারের প্রশাসনিক ও ডিজিটাল পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে ডিসিসিআই সভাপতি জানান, কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনতে অনলাইন করপোরেট প্ল্যাটফর্ম, অটোমেটেড ফেসলেস রিফান্ড এবং রিস্ক-বেইজড ডিজিটাল অডিট সিলেকশন চালু করা হচ্ছে। ডিজিটাল অর্থনীতির সুফল নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি’ এবং ‘ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। 

পাশাপাশি সরকারি সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার এবং দেশের ৯০ শতাংশ এলাকায় দ্রুতগতির ফাইভ-জি ইন্টারনেট সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে এক দিনের মধ্যে মুনাফা ফেরত, সাত দিনের মধ্যে ব্যবসার চূড়ান্ত অনুমোদন, বিদেশি কোম্পানির দ্রুত ওয়ার্ক পারমিট এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ৬ থেকে ১২ মাসের প্রফেশনাল অনুমোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তবে বাজেট ও রাজস্ব আহরণের নানা চ্যালেঞ্জও তুলে ধরা হয়। ২০২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু মোট বাজেটের ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কেবল ঋণ পরিশোধের ব্যয় হিসেবে বরাদ্দ রাখতে হওয়ায় সরকারের সক্ষমতার ওপর বিরাট আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। 

এ ছাড়া দেশে ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও তুলনামূলক কম হওয়ায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন একটি বড় সংকট। এ সমস্যা নিরসনে দেশীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বল্প সুদে বৈদেশিক ঋণ ও নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি ২০৩৫ সালের মধ্যে ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও ১৫ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

মুদ্রানীতি ও ব্যাংকিং খাতের সংকট তুলে ধরে বলা হয়, বর্তমান মুদ্রানীতিতে পলিসি রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করা সত্ত্বেও বেসরকারি খাতের ঋণে গতি ফেরেনি। অধিকন্তু দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি (৮.৩২ শতাংশ) সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ৪ শতাংশ স্প্রেড সিএসএমই খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। উচ্চ সুদের হার এবং সরকারের ব্যাংকনির্ভরতার কারণে বেসরকারি খাত বঞ্চিত হচ্ছে। এর সমাধান হিসেবে পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়ানো, করপোরেট বন্ড ও সুকুক বাজারের দ্রুত সম্প্রসারণ করার আহ্বান জানানো হয়।

অন্যান্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে লজিস্টিক খাতের অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির ১৫ থেকে ২০ শতাংশ, যেখানে উন্নত বিশ্বে তা ৮ থেকে ১০ শতাংশ। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ও সহজ শর্তের ঋণ হারাবে, তা মোকাবিলায় এফটিএ ও পিটিএ চুক্তি ত্বরান্বিত করা জরুরি বলে মত প্রকাশ করা হয়।

ওই সেমিনারে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার, আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। 


এ ছাড়া সেমিনারের প্যানেল আলোচনায় মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান অংশ নেন।

আলোচকরা একযোগে ২০২৬ অর্থবছরের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয়, লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জোর দাবি জানান।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   মন্দা  মূল্যস্ফীতি  বেসরকারি খাত  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: