বাজারে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বাড়ার কারণে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাকে। একইসঙ্গে অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ায় ভোক্তার কষ্টের মাত্রাটা আরও বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ রাজধানীর বাজারে একের পর এক নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২০০ টাকায় মিলছে না কোনো মাছ। একই সঙ্গে ডিমের ডজন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা হওয়ায় বাড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সংসার খরচ। শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাংসের বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা বেড়ে এখন বিক্রি হয়েছে ১৯০ টাকা, সোনালি ৩২০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি। ডিমের বাজারেও অস্বস্তি অব্যাহত রয়েছে। সাদা ডিমের ডজন ১৩০ টাকা, বাদামি ডিম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। তবে এলাকাভেদে বাজার ও পাড়া-মহল্লায় এসব পণ্যের দামে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। পাড়া-মহল্লার দোকানে ডিম ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মুরগি বিক্রেতারা বলেন, গত সপ্তাহে তুলনায় এই সপ্তাহে মুরগির দাম আগের মতো আছে। আজকে ১৯০ টাকা কেজি বিক্রি করেছি। গত সপ্তাহে একই দাম ছিল। সোনালি মুরগির দাম আগের মতোই আছে। ৩২০ টাকা কেজি বিক্রি করেছি।
মাছের বাজারেরও একই চিত্র। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০, রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ এবং চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি। পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০, বড় আকারের রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ ও ট্যাংরা ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চাষের শিং মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে। মাঝারি আকারের রুই কেনা যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে। এ ছাড়া, রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে গেলে হাজারের বেশি টাকা গুনতে হবে। ৯০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৫০০, আর ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রায় ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতারা বলেন, বাজারে মাছ কিনতে এসে এখন রীতিমতো অবাক হতে হয়। ২৫০ টাকার নিচে কোনো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তেলাপিয়াও আড়াইশ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের জন্য বাজার করাই কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। মাছের দামে বড় কোনো পরিবর্তন নেই, আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারে একদিন ২০ থেকে ৩০ টাকা কমছে তো পরদিনই আবার বাড়ছে।
ক্রেতারা জানান, বাজারে এসে এখন মাছ, মুরগি আর ডিম কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। একটার দাম একটু কম, তো আরেকটার দাম বেড়ে যাচ্ছে। ২০০ টাকার মধ্যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না, ব্রয়লার মুরগির দামও অনেক বেশি। ডিমের দামও বেড়ে গেছে। আমাদের আয় তো সেভাবে বাড়েনি, কিন্তু বাজার খরচ প্রতিদিনই বাড়ছে। আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন সেই টাকা কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে যাবে।
আটা-তেল-চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী
এদিকে বাজারে বোতলজাত ভোজ্যতেলের সরবরাহ কমিয়েছে কোম্পানিগুলো। এরমধ্যে খোলা তেল ও চিনির দাম দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে আটা-ময়দার দামও। অন্যদিকে সবজি, মাছ-মাংস ও ডিমের দাম এখনো উচ্চমূল্যেই আটকে আছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে প্যাকেটজাত আটা প্রতি কেজি ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৫ থেকে ২০ দিন আগেও এই আটা বিক্রি হয়েছে ৫৫ টাকায়। অর্থাৎ, কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ টাকা। একই ভাবে ময়দার দামও বেড়েছে। খোলা ময়দা এখন প্রতি কেজি ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা কোম্পানিভেদে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চিনির বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি চিনি ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ১০ টাকা। বিক্রেতারা বলছেন, প্যাকেটজাত চিনির দামও বাড়তে পারে।
বিক্রেতারা বলেন, কয়েকদিনের ব্যবধানে ৫০ কেজির এক বস্তা চিনির দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে ডিলাররা। সামনে প্যাকেটজাত চিনির দামও বাড়তে পারে বলে তারা জানিয়েছেন।
এদিকে, বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ কমেছে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি হিসেবে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক দোকানেই চাহিদা অনুযায়ী বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম এখনো বাড়েনি। প্রতি লিটার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে এরই মধ্যে বেড়েছে খোলা তেলের দাম। বাজারে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা পাম তেলের দাম প্রতি লিটার ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা।
সবজির দাম এখনও চড়া
অপরদিকে গেল মাসের তুলনায় বাজারে সবজির দাম কিছুটা কমে আসলেও এখনো চড়া। তবে মৌসুম না হওয়ার অজুহাতে এখনও বাজারে বেগুন, শিম, গাজর, বরবটি, টমেটো ১০০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান বাজারে এই সবজিগুলোরই দাম তুলনামূলক বেশি। বাকি সবজিগুলোর দাম প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে রয়েছে।
বাজারে প্রতিকেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়, কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা, পটল ৬০ টাকা, শসা ৬০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা এবং ঝিঙা ও চিচিঙ্গা ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া, কাঁকরোল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, ঢ্যাঁড়স ৬০ টাকা, শিম ২০০ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা, গাজর ১৪০ টাকা, ধন্দুল ৬০ টাকা, মুলা ৮০ টাকা এবং বেগুন ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ানবাজারের ক্রেতা আনিসুর রহমান বলেন, তুলনামূলক সবজির দাম কিছুটা কমেছে, তবে চার পাঁচ ধরনের সবজি দাম এখনো অতিরিক্ত বেশি, যেগুলো ১০০ থেকে ১৪০ টাকা প্রতি কেজি। বাকি সবজিগুলোর দাম এখন তাও তুলনামূলক ঠিক আছে, বর্তমান বাজারে অন্যান্য সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসাব করলে গত মাসে সবজির দাম আকাশচুম্বী ছিল, সেই তুলনায় এখন সবজির দাম কিছুটা কম যাচ্ছে।
সবজির দামের বিষয়ে একই বাজারের সবজি বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, বেগুন, শিম, গাজর, বরবটি ও টমেটোর মৌসুম না হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা কম রয়েছে। ফলে এই নির্দিষ্ট সবজিগুলোর দাম তুলনামূলক একটু বেশি। সবজিগুলো ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৪০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। তবে অন্যান্য সবজির দাম আগের তুলনায় কমেছে। বাজারে অন্যান্য সব সবজি ৬০ টাকা থেকে শুরু করে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদি টানা বৃষ্টি না হয় তাহলে সবজির দাম এমনই থাকবে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ