তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দেশের পোশাক কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন একটি বড় সম্ভাবনার পথ উন্মোচন করেছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক গবেষণা অনুযায়ী, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের কারখানার ছাদ ব্যবহার করে প্রায় ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট (প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত ‘পোশাক খাতের শিল্প-কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ : চীনা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সিপিডির পক্ষে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রুফটপ সোলার ইন আরএমজি সেক্টর’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংস্থাটির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আবরার আহমেদ ভূঁইয়া ও প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট নূর ইয়ানা জান্নাত।
বিদ্যুৎ সংকট, সম্ভাবনা ও খরচ : দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কারখানা বর্তমানে তাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ৮৭৮টি কারখানার ওপর চালানো সমীক্ষায় দেখা যায়, বর্তমানে এসব কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসছে।
সিপিডির মতে, পোশাক খাতের ৯৭ লাখ বর্গমিটার ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে রূপান্তর করা সম্ভব। এর মাধ্যমে এই খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটের গড় খরচ মাত্র ৩ টাকা ৪ পয়সা, যা জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের দামের অর্ধেকেরও কম। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচ কমিয়ে শিল্প খাতকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।
অর্থায়ন ও সুদের হারের চ্যালেঞ্জ
সিপিডির গবেষণাপত্রে বলা হয়, পোশাক খাতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্ভাব্য সর্বমোট ১০৩ কোটি মার্কিন ডলার বা ১২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। ৩০০ কিলোওয়াট বা তার বেশি সক্ষমতার ২ হাজার ৩০৩টি কারখানায় অবিলম্বে প্রায় ১৮ কোটি ৮২ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমেই বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তবে এই বিশাল সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার। সুদের হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি হলে এ ধরনের প্রকল্প বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে বিনিয়োগযোগ্যতা হারায়। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, বর্তমানে প্রায় ৫০০ কারখানা সৌরবিদ্যুতে নিজস্ব বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত। যদি সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে ‘গ্রিন ফাইন্যান্স’ বা রেয়াতি ঋণের সুযোগ পাওয়া যায়, তবে আরও ১ হাজার ৩০০টি কারখানা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে যুক্ত হতে পারবে। এ ছাড়া আরও ৪০০টির বেশি কারখানার জন্য সরকারি ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ ও চীনা বিনিয়োগ
বিশ্বের শীর্ষ পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান যেমন এইচঅ্যান্ডএম, ইনডিটেক্স, ওয়ালমার্ট, গ্যাপ এবং এমঅ্যান্ডএস বর্তমানে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০৩৫ সালের মধ্যে কারখানায় অন্তত ৩৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা জরুরি হয়ে পড়তে পারে। এ অবস্থায় চীনা প্রযুক্তি, সহজ অর্থায়ন ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুতের দ্রুত বিস্তার ঘটানো সম্ভব বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।
অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী শিল্প খাতের বাস্তব সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন সত্ত্বেও মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ এবং মোট জ্বালানি চাহিদার ৬ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। মূলত কারখানাগুলো বহুতল ভবনে হওয়ায় চাহিদার তুলনায় ছাদের পরিমাপ সীমিত থাকে। যেমন জিরানি বাজারে তাদের একটি কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদা ১.৫ মেগাওয়াট হলেও ছাদের জায়গায় মাত্র ২৭২ কিলোওয়াট সোলার বসানো সম্ভব হয়েছে।
সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে, উৎপাদন ব্যয় কমাতে, পরিবেশ রক্ষা করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাকের ধারাবাহিকতা ও প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ এখন বিকল্প ব্যবস্থা নয়, বরং শিল্পের ভবিষ্যতের এক অপরিহার্য অংশ।
আলোচনা অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কান্ট্রি লিয়াজোঁ নুসরাত জাহান, বিআরইবির প্রধান প্রকৌশলী স্বপন বণিক, বিএসআরের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি জাহিদুল আলম এবং বিকেএমইএর পরিচালক মিনহাজুল হকসহ খাতের নীতিনির্ধারণী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা