বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে স্বস্তি নেই ক্রেতাদের। এর মধ্যে নতুন করে ভোগান্তি বাড়িয়েছে সয়াবিন তেল ও চিনির সরবরাহ সংকট। নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি দামে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এখন বেশিরভাগ দোকানে প্যাকেটজাত এক কেজি চিনির খুচরা মূল্য ১১০ টাকা হলেও তা ১২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আবার এক লিটার সয়াবিন তেল ২০৪ টাকার পরিবর্তে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও প্যাকেট চিনি ও বোতলের তেল মিলছে না। খোলা তেল-চিনি বিক্রি হচ্ছে প্যাকেটজাত পণ্যের দামে। এর সঙ্গে ডিমের দামও রয়েছে বাড়তি। ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে এসে বাড়তি দামে পণ্য কিনতে গিয়ে নাজেহাল হচ্ছেন ক্রেতারা। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
মুদি দোকানিরা জানান, এখন চিনির প্যাকেটের গায়ে দাম লেখা আছে ১১০ টাকা। তবে তাদের কিনতে হচ্ছে ১১৩ টাকায়। বাধ্য হয়ে তারা ১১৫ থাকে ১২০ টাকা বিক্রি করছেন। যে কারণে এখন অনেক দোকানে প্যাকেট চিনি রাখা হচ্ছে না। আবার অনেক দোকানে প্যাকেট কেটে খোলা চিনি ১২০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।
খলিলুর রহমান নামে এক বিক্রেতা বলেন, ‘প্যাকেটের গায়ে ১১০ টাকা দাম লেখা, যে কারণে ক্রেতার কাছে ১২০ টাকা নিতে গেলে অনেক জবাবদিহি করতে হয়। উপায় না পেয়ে প্যাকেট কেটে খোলা বিক্রি করলে ঝামেলা কম।’
মালিবাগ বাজারে একজন ক্রেতা বলেন, ‘এমনিতেই সব জিনিসের দাম বেশি। এর মধ্যে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা চাইলে আমাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। বিষয়টি সরকারের কঠোরভাবে নজরদারি করা উচিত।’
কয়েক সপ্তাহ ধরে সরবরাহ সংকট কাটেনি সয়াবিন তেলের। খুচরা বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। যেসব দোকানে তেল রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই তা ক্রেতাদের চোখের সামনে না রেখে অন্যত্র রাখা হচ্ছে। সুযোগ বুঝে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি দামও।
সম্প্রতি সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এরপরও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আরও দাম বাড়ানোর দাবি উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে দাম সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
আর দাম আরেক দফা না বাড়া পর্যন্ত কোম্পানিগুলো খুচরা ব্যবসায়ীদের ঠিকমতো তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করবে না বলে জানিয়েছেন বিক্রয় প্রতিনিধিরা।
সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের মামা-ভাগ্নে সুপার শপের বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় এক-দেড় মাস হলো কোম্পানি তেলের অর্ডার নিতে চায় না। কমিশন কমিয়ে লিটারপ্রতি মাত্র ১ টাকা করেছে। তারপরও বিভিন্ন পাইকারি বাজার থেকে ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে তেল সংগ্রহ করছি নিজ খরচে।
তিনি বলেন, তেল-চিনি ছাড়া তো মুদি দোকান চলতে পারে না। বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রচুর ঝামেলা ও বাকবিতণ্ডা করতে হয়। যে কারণে অপরিচিত কাস্টমার এলে তেল-চিনি বিক্রিই করি না। তবে খুচরা বাজারে সরবরাহ সংকটের কথা বলা হলেও সুপারশপগুলোতে প্যাকেটজাত তেল ও চিনি পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামেই বিক্রি করতে দেখা গেছে।
ডিমের দামও ক্রেতাদের স্বস্তি দিচ্ছে না। সপ্তাহখানেক আগে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনপ্রতি প্রায় ৫ টাকা বেড়েছে। এখন বিভিন্ন বাজারে প্রতি ডজন ডিম ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। আর পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে এক হালি ডিম ৫৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে অর্থাৎ সেখানে ডজন পড়ে ১৬৫ টাকা। তবে ব্রয়লার মুরগির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
সবজির দামও বেশি : রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দামে এখনও স্বস্তি ফেরেনি। অধিকাংশ সবজিই বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। শীতের সবজির মৌসুম ঘনিয়ে এলেও বাজারে এর প্রভাব এখনও তেমন একটা পড়েনি। ফলে বাড়তি দামে সবজি কিনতে গিয়ে চাপে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। এ দিকে স্থানভেদে ডিমের দাম বেড়েছে। মুরগি আগের দামেই বিক্রি হলেও কিছু মাছের দাম বেড়েছে।
গতকালের বাজারে করলা, লতি, পটোল, কাঁকরোল ও শসা ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ঢ্যাঁড়শ ৬০ টাকা। লাউ আকারভেদে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া গাজর ১৪০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা, টমেটো ১২০ টাকা, আলু ৩০ টাকা, পেঁয়াজ ৫০ টাকা, শিম ২০০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা এবং গোল বেগুন ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লম্বা বেগুন ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
সবজির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে শিম। প্রতি কেজি শিমের দাম ২০০ টাকা। এ ছাড়া গাজর ও গোল বেগুন ১৪০ টাকা এবং টমেটো ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে কিছুটা কমেছে কাঁচামরিচের দাম। আগে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
কিছু মাছের দাম বেড়েছে : মাছের বাজারেও খুব একটা স্বস্তি নেই। রুই মাছ আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, গত সপ্তাহে এর দাম ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, পাবদা ৬০০ টাকা, কই ৩৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৩০ টাকা এবং পাঙাশ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ি আকারভেদে প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পাবদা মাছের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা কেজি দরে। ছোট-বড় অন্যান্য মাছও মান ও আকারভেদে বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে।
অপরিবর্তিত মুরগির দাম মুরগির বাজারে আগের মতোই ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কক মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ টাকা কেজিতে। তবে ডিমের দামে স্থানভেদে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও