ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানলের মধ্যে নতুন করে সামনে এসেছে দুই বিশ্বযুদ্ধের ভয়ংকর এক উত্তরাধিকার। আগুনের তীব্র তাপে মাটির নিচে বছরের পর বছর চাপা পড়ে থাকা বোমা, মাইন ও অন্যান্য বিস্ফোরক অস্ত্র বেরিয়ে আসছে, এমনকি কোথাও কোথাও বিস্ফোরণও ঘটছে।
চলতি গ্রীষ্মে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন এলাকায় দাবানলের আগুনে পুরোনো যুদ্ধাস্ত্র বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। আগুনের কারণে একদিকে যেমন মাটির নিচে থাকা অস্ত্রের অবস্থান প্রকাশ পাচ্ছে, অন্যদিকে প্রচণ্ড তাপ এগুলোকে সক্রিয় করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপের দীর্ঘদিনের আবহাওয়াগত স্থিতিশীলতা বদলে যাওয়ায় এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা, উচ্চ তাপমাত্রা, কম আর্দ্রতা ও প্রবল বাতাস দাবানলকে ভয়াবহ করে তুলছে। আগুন পুড়িয়ে দিচ্ছে ঝোপঝাড় ও উদ্ভিদ, যেগুলোর নিচে লুকিয়ে ছিল পুরোনো বিস্ফোরক।
ফ্রান্সের বোর্দোর কাছে একটি বনাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বলে ধারণা করা বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদের সন্ধান পাওয়া গেছে। বেলজিয়ামের লিয়েজ প্রদেশেও দাবানলকবলিত এলাকায় কয়েক দফা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সেখানে জরুরি সেবাদানকারী দলগুলোকে পুরোনো যুদ্ধাস্ত্রের ঝুঁকি মাথায় রেখে কাজ করতে হচ্ছে।
বেলজিয়ামের হাই ফেন্স এলাকায় ঝুঁকিটা আরও বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওই ঘন বনাঞ্চলে বোমা, মাইন ও ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছিল। এলাকাটি বিখ্যাত ‘ব্যাটল অব দ্য বাল্জ’-এর যুদ্ধক্ষেত্রের অংশ ছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও এসব বিস্ফোরক বহু বছর ধরে বেসামরিক মানুষের প্রাণ কেড়েছে।
বেলজিয়ামে এখনো প্রতিবছর পুরোনো যুদ্ধাস্ত্র উদ্ধারের জন্য ৩ হাজারের বেশি জরুরি ডাক আসে। দেশটির বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী দল প্রতিবছর দুই বিশ্বযুদ্ধের সময়কার প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টন গোলাবারুদ ধ্বংস করে।
তবে শুধু দাবানলই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদী ও জলাশয়ের পানি কমে যাওয়ায় পানির নিচে থাকা পুরোনো অস্ত্রও বেরিয়ে আসছে। স্লোভাকিয়ায় দানিউব নদীর পানি কমে দুটি নৌমাইন দৃশ্যমান হয়। হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে মার্গারেট ব্রিজের কাছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি বোমা বেরিয়ে আসায় সেতুটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। জার্মানিতেও রাইন নদীর পানি কমে একটি পুরোনো বোমার সন্ধান পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপের মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা যুদ্ধের উত্তরাধিকার যেন আবারও সামনে চলে আসছে। ফলে প্রায় এক শতাব্দী আগের যুদ্ধের বিস্ফোরক অস্ত্র এখন নতুন করে প্রাণ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
সময়ের আলো/কেএইচ