ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও দুই দেশের সিন্ধি সম্প্রদায়ের মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক এখনো অটুট রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে পাকিস্তানের ১৫০ জন কনে ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিশেষ ব্যবস্থায় ভিসা দিয়েছে ভারত।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ থেকে অন্তত ১০ লাখ সিন্ধি হিন্দু ভারতে চলে আসেন। বর্তমানে তারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও শহরে সরকারি বা নিজেদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কলোনিতে বসবাস করছেন। তবে মাতৃভূমি সিন্ধু ও সেখানে থাকা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি।
দুই দেশের সিন্ধি সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যাতায়াতের রীতি রয়েছে। পাকিস্তানি নারীদের ভারতীয় পুরুষদের সঙ্গে এবং ভারতীয় সিন্ধি নারীদের পাকিস্তানি সিন্ধি পুরুষদের সঙ্গে বিয়ে হওয়াও নতুন নয়। এত দিন তারা ওয়াগা-আত্তারি সীমান্ত দিয়ে ভিসা নিয়ে তুলনামূলক সহজেই দুই দেশে যাতায়াত করতে পারতেন।
তবে গত বছর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর ৬ মে মধ্যরাতের পর পাকিস্তান ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে সক্রিয় নয়টি জঙ্গি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালায় ভারত। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত ওই অভিযানের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও অবনতি হয়।
এরপর ভারত পাকিস্তানি সিন্ধি দর্শনার্থীদের জন্য ভিসা ও সীমান্ত রুট বন্ধ করে দেয়। ফলে দুই দেশের মধ্যে কয়েক শ বিয়ে আটকে যায়। বাগদান সম্পন্ন হওয়ার পরও অনেক পাকিস্তানি সিন্ধি নারী ভারতে এসে বিয়ে করে সংসার শুরু করতে পারছিলেন না।
দীর্ঘ আলোচনা ও উদ্যোগের পর অবশেষে এই জট খুলেছে। বিশেষ ব্যবস্থায় পাকিস্তানের ১৫০ জন কনে ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ভিসা দিয়েছে ভারত। তবে তাদের সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আকাশপথে ভ্রমণের শর্তে তাদের ভিসা দেওয়া হয়েছে। ফলে আগের মতো ওয়াগা-আত্তারি সীমান্ত দিয়ে সরাসরি ভারতে এসে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই।
পাকিস্তানি সিন্ধি অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সামাজিক নেতা রাজেশ ঝাম্বিয়া বলেন, ‘অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো। ভারত পাকিস্তানে আটকে পড়া কনে এবং তাদের আত্মীয়দের ভিসা দিয়েছে। ফলে তারা অন্য দেশের ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে ভারতে পৌঁছাতে পেরেছেন।’
তিনি জানান, সিন্ধি সম্প্রদায়ের মানুষ এ ধরনের বিয়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে পাঞ্জাবের ওয়াগা-আত্তারি সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতে আসতেন। কিন্তু ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। আত্তারি রুট দিয়ে ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা করা ব্যক্তিদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
ভিসা সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তারা ছত্তিশগড়ের রায়পুরভিত্তিক সন্ত যুধিষ্ঠিরলাল শাদানির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের ঘোটকিতে অবস্থিত বিশিষ্ট হিন্দু ধর্মীয় উপাসনালয় ‘শাদানি দরবার’-এর আধ্যাত্মিক প্রধান।
সন্ত যুধিষ্ঠিরলাল শাদানি ভারতে পুরুষদের সঙ্গে বাগদান হয়ে যাওয়া পাকিস্তানি নারীদের একটি তালিকা তৈরি শুরু করেন। রাজেশ ঝাম্বিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই তালিকায় অন্তত ১৫০ জন কনে ছিলেন। তাদের ভারতের নাগপুর, রায়পুর, যোধপুর, পুনে এবং অন্যান্য শহরে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।
পরে মন্দির কর্তৃপক্ষ ওই তালিকা নিয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এসব কনে ও তাদের পরিবারের সদস্যরা যাতে ভারতে এসে বিয়েতে অংশ নিতে পারেন, সে জন্য ভিসার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হয়।
ঝাম্বিয়া জানান, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সীমান্তের ওপার থেকে আসা এসব দর্শনার্থীকে শুধু বিমানে ভ্রমণের শর্তে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেয়।
তার দাবি, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে পাকিস্তানের ১৫০ জন কনে ও তাদের পরিবারের সদস্যরা বিয়ের জন্য দুবাই, ওমান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ হয়ে আকাশপথে ভারতে পৌঁছেছেন। এর মধ্যে নাগপুরে ১৫টি বিয়ের ঘটনা রয়েছে।
রাজেশ ঝাম্বিয়া আরও জানিয়েছেন, পাকিস্তানে এখনো এ ধরনের প্রায় ৩০০ নারী অপেক্ষায় রয়েছেন। তারাও ভারতীয় সরকারের কাছে ভিসা পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন, যাতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিয়ে ও পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা কাটিয়ে ভারতে এসে তাদের নতুন জীবন শুরু করতে পারেন।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ