যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে আবারও তেহরানে যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। চলতি বছর এটি হবে তার তৃতীয় ইরান সফর। একদিকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পথ কার্যত অচল, অন্যদিকে নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মুনিরের এই সফরকে শুধু দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ নয়, বরং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমানোর পাকিস্তানি প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার (২৪ আগস্ট) তেহরানে মুনিরের ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। এই সফরের বিস্তারিত কোনো কর্মসূচি প্রকাশ করা হয়নি। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, এই সফর আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারে পাকিস্তানের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেবে।
মুনিরের সফরের গুরুত্ব আরও বেড়েছে তার সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে দুই দফা ফোনালাপের কারণে। চার দিনের ব্যবধানে হওয়া ওই আলোচনায় আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
তৃতীয় সফর, কিন্তু অচলাবস্থা কাটেনি
চলতি বছর এপ্রিল ও মে মাসে মুনির দুবার ইরান সফর করেন। তার এপ্রিলের সফর হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম সরাসরি আলোচনার পরপরই। মে মাসের সফরের সময়ও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনায় সামান্য অগ্রগতির কথা জানিয়েছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
কিন্তু এরপর পরিস্থিতি বদলে গেছে। পাকিস্তান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ৬০ দিনের সময়সীমা আগস্টের মাঝামাঝি শেষ হয়েছে। সেই সমঝোতার মেয়াদও বাড়েনি। ফলে পাকিস্তানের নেতৃত্বে চলা মধ্যস্থতার উদ্যোগ এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে।
এদিকে ইরান দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্রকে আগে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, তেল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, বিদেশে থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং সামরিক হুমকি বন্ধ করতে হবে। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটন এসব শর্ত পূরণ করেনি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও চাপ কমানোর বদলে নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে মুনির এমন এক সময়ে তেহরানে যাচ্ছেন, যখন কূটনৈতিক সমঝোতার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
আলোচনায় হরমুজ ও হুথিরা
মুনিরের এবারের সফরে শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর তৎপরতা।
হুথিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। তাই ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় হুথি ইস্যুও গুরুত্ব পেতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ। ১১ আগস্ট বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুথিদের হামলায় তানজানিয়ার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে তিন পাকিস্তানি নাবিক নিহত হন। ওই হামলার পর পাকিস্তানের তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানান।
অর্থাৎ, আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তানের কূটনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি নিজস্ব নিরাপত্তা ও নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টিও জড়িয়ে আছে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রভাব
মুনিরের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মুনির নিজেও চুক্তি স্বাক্ষরের সময় মক্কায় উপস্থিত ছিলেন। ফলে তেহরানে তার আলোচনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, উপসাগরীয় শক্তিগুলোর অবস্থান এবং ইরানের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্কও গুরুত্ব পেতে পারে।
এদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও চলতি মাসের শুরুতে মধ্যস্থতার উদ্যোগ পুনরুজ্জীবিত করতে তেহরান সফর করেছিলেন। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো ফলাফল ছাড়াই তাকে ফিরতে হয়।
পাকিস্তান কি সত্যিই ‘সেতু’ হতে পারবে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। পাকিস্তান নিজেকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরলেও, বাস্তবে এই ভূমিকা কতটা কার্যকর— তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক সানোবার ইনস্টিটিউটের প্রধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কামার চিমার মতে, পাকিস্তান এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেও কোনো পক্ষের কাছ থেকে সরাসরি লাভের প্রত্যাশা না থাকার কারণে দেশটি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হতে পারে।
তবে তেহরানের পারস্য উপসাগরীয় অধ্যয়ন গোষ্ঠীর পরিচালক জাভাদ হেইরান-নিয়া পাকিস্তানের এই তৎপরতায় নিজেদের স্বার্থও দেখছেন। তার মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন করে বড় যুদ্ধে রূপ নিলে পাকিস্তান নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর পাকিস্তানের নির্ভরতা এবং সেখানে কর্মরত পাকিস্তানি শ্রমিকদের রেমিট্যান্স— দুটিই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অর্থাৎ, পাকিস্তানের মধ্যস্থতার পেছনে কূটনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও এর সঙ্গে দেশটির নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থও গভীরভাবে জড়িত।
কাতার নাকি পাকিস্তান— কার প্রভাব বেশি?
তবে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশয় এসেছে লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের কাছ থেকে।
তার মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগে প্রধান মধ্যস্থতাকারী এখনো কাতার। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কাতার গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করছে।
ক্রিগের বিশ্লেষণে মুনিরের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট— তিনি মূলত ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যোগাযোগের একটি চ্যানেল হিসেবে কাজ করতে পারেন। বিশেষ করে যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও বৃহত্তর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বাড়ায় এই সামরিক যোগাযোগ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখানেই মুনিরের সফরের বিশেষত্ব। পাকিস্তান হয়তো ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইরানের রাজনৈতিক দর-কষাকষির সরাসরি নিয়ন্ত্রক নয়, কিন্তু ইরানের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে তার যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।
মুনির কী অর্জন করতে পারেন?
ইরানি সাংবাদিক রেজা আফজাল সামির মনে করেন, পাকিস্তানের হাতে এখনো এমন কিছু প্রভাব রয়েছে, যা কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে কাজে লাগতে পারে। তার মতে, নিষ্ক্রিয়তার বদলে পাকিস্তান এমন একটি পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে, যেখানে ইরান আবার আলোচনায় ফিরতে আগ্রহী হবে।
তার ধারণা, মুনিরের সফরের পর হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনায়ও অগ্রগতি হতে পারে। বিশেষ করে ইরান ও ওমানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার পথ তৈরি হলে তা বৃহত্তর সংঘাত প্রশমনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ক্রিগের মূল্যায়ন অনেক বেশি সতর্ক। তার মতে, মুনিরের সফরের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ফল হতে পারে হরমুজ-সংক্রান্ত সমঝোতা মেনে চলার নিশ্চয়তা পাওয়া। একই সঙ্গে ইয়েমেন বা ইরাকের মাধ্যমে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর ক্ষেত্রেও ইরানের প্রভাব কাজে লাগানো যেতে পারে।
কিন্তু এর জন্য ওয়াশিংটনের কাছ থেকেও পাল্টা পদক্ষেপ প্রয়োজন। শুধু এক পক্ষকে বোঝাতে পারলে হবে না; উভয় পক্ষকেই উত্তেজনা কমানোর জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
আসল সীমাবদ্ধতা কোথায়?
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো— ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র, কোনো পক্ষের ওপরই তার এমন প্রভাব নেই যে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।
ইরান নিজের নিরাপত্তা, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের প্রশ্নে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপকে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে পাকিস্তানের মতো তৃতীয় একটি দেশের পক্ষে দুই পক্ষের মৌলিক মতবিরোধ দূর করা কঠিন।
তবে মধ্যস্থতায় সাফল্য সবসময় বড় কোনো চুক্তি দিয়ে মাপা হয় না। কখনো কখনো যোগাযোগের একটি কার্যকর চ্যানেল খোলা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ ভেঙে পড়ে, তখন তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। মুনিরের তেহরান সফরের গুরুত্ব সম্ভবত এখানেই।
অচলাবস্থা ভাঙবে, নাকি শুধু যোগাযোগ টিকে থাকবে?
সব মিলিয়ে মুনিরের এবারের তেহরান সফরকে বড় কোনো চুক্তির পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ এখনই নেই। বরং এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার আরেকটি পরীক্ষা।
পাকিস্তান যদি ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের সঙ্গে নিজের যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারে এবং একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে পাল্টা ছাড় আদায়ে কাতার বা ওমানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে, তাহলে ইসলামাবাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু তা না হলে মুনিরের সফর হয়তো শুধু একটি ‘যোগাযোগের সেতু’ খোলা রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য তাই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক লাফে বড় সমঝোতা নয়; বরং হরমুজ প্রণালী, আঞ্চলিক হামলা এবং সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আবারও আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা। সেই পরীক্ষায় মুনির কতটা সফল হন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র : আল জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি