বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের মতবিরোধের কারণে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে আসছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার প্রথম ভারত সফর চলতি মাসে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করায় সফরের পরিকল্পনায় জটিলতা তৈরি হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই সংবাদ সম্মেলনের পর দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ আগের মতো নেই। প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন।
হাসিনাকে ঘিরেই মূল বিরোধ
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে।
ঢাকার অভিযোগ, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল।
গত ৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার কথাও বলেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে ঢাকার অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়।
ভারত অবশ্য জানিয়েছে, শেখ হাসিনার ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনের সঙ্গে দেশটির সরকারের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
ভারত কী বলছে?
তারেক রহমানের সফর নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ বিষয়ে বলেন, এ মুহূর্তে তার বলার মতো কিছু নেই।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে। এক দেশের স্বার্থকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি অন্য দেশের স্বার্থকেও সম্মান করতে হবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের দূত দিনেশ ত্রিবেদীও ঢাকাকে অতীতের বিরোধ পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে আরও যেসব বিষয় নিয়ে টানাপোড়েন
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ছাড়াও সীমান্ত, অবৈধ অভিবাসন এবং দুই দেশের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
বাংলাদেশের অভিযোগ, ভারত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের যাচাই-বাছাই ছাড়াই ফেরত পাঠাচ্ছে। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব বিষয়ও দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে।
এদিকে শেখ হাসিনার আমলের তুলনায় বর্তমান বাংলাদেশ সরকার চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এতে নয়াদিল্লির জন্যও নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আলোচনার বিকল্প নেই
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান এখনো অনেকটাই ভিন্ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দূরত্ব কমবে না। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা ও যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
তাদের মতে, শেখ হাসিনা ইস্যুতে মতবিরোধ থাকলেও বাণিজ্য, নিরাপত্তা, সীমান্ত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও ভারতকে বাস্তব স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনেরই একটি বড় ইঙ্গিত। তবে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ