যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত ইরান। এর মধ্যেই দেশটির রাজপথে প্রকাশ্যে হিজাব না পরা নারীর সংখ্যা বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে সরকার এখন বেশ কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় অনেক নারী মাথায় হিজাব ছাড়াই চলাফেরা করছেন। এমনকি সরকারপন্থি কিছু অনুষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ফুটেজেও হিজাব ছাড়া নারীদের দেখা গেছে।
একটি ভিডিওতে জাতীয় পতাকা হাতে এক নারীকে বলতে শোনা যায়, তার স্বামী সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং তিনি তাকে নিয়ে গর্বিত।
বর্তমানে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্গঠন নিয়ে ব্যস্ত ইরানি কর্তৃপক্ষ। ফলে নারীদের পোশাকবিধি কঠোরভাবে কার্যকর করার বিষয়টি আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে দেশটির কট্টরপন্থিরা আবারও হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি তুলেছেন। তারা প্রকাশ্যে হিজাব না পরাকে আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
মাহসা আমিনির পর বদলে যায় পরিস্থিতি
ইরানে নারীদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা হয় ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে। পরে নারীদের পোশাকবিধি মানাতে ‘গাইডেন্স পেট্রোল’ বা নীতি পুলিশের কার্যক্রম জোরদার করা হয়।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ২২ বছর বয়সী কুর্দি-ইরানি তরুণী মাহসা আমিনিকে হিজাব ঠিকমতো না পরার অভিযোগে নীতি পুলিশ আটক করে। তিন দিন পর পুলিশ হেফাজতে তার মৃত্যু হয়।
তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানে ছড়িয়ে পড়া ওই আন্দোলনে বহু নারী প্রকাশ্যে হিজাব খুলে ফেলেন। কেউ কেউ মাথার স্কার্ফ পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানান।
জাতিসংঘের একটি তদন্তে বলা হয়, আমিনির মৃত্যু বেআইনি বলপ্রয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত অতিরিক্ত শক্তি নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়।
কঠোর হিজাব আইনও স্থগিত
২০২৪ সালে ইরান হিজাব আইন আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেয়। নতুন আইনে জরিমানা ও নজরদারি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল।
তবে দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে আইনটির বাস্তবায়ন স্থগিত করা হয়।
এতে কট্টরপন্থিদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। তারা সরকারকে আবারও কঠোরভাবে হিজাব আইন কার্যকর করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
নারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে দ্বিধায় সরকার?
বর্তমানে ইরানের রাস্তায় পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অনেক নারী মাথায় স্কার্ফ ছাড়াই স্কুটার চালাচ্ছেন, রাস্তায় হাঁটছেন এবং বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরছেন।
তেহরানের এক ষাটোর্ধ্ব নারী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, কর্তৃপক্ষ এখনো নারীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চাইছে না। তার দাবি, শহরের অনেক নারী এখন ক্রপ টপ, শর্টসসহ বিভিন্ন পোশাকে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন।
তার ভাষায়, আমি মনে করি না তারা আবার এসব মেয়েকে মাথায় স্কার্ফ পরাতে পারবে। তবে তিনি একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরও অনেক নারী মনে করেছিলেন, তাদের কখনো বাধ্যতামূলক হিজাব পরানো সম্ভব হবে না। শেষ পর্যন্ত সরকার তা করতে সক্ষম হয়েছিল।
পেজেশকিয়ানের ভিন্ন অবস্থান
নারীদের পোশাক নিয়ে জোর করে পরিবর্তন আনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
নিজের মেয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আচরণ পরিবর্তন মূলত একটি সাংস্কৃতিক ও বিশ্বাসের বিষয়। জোর করে মানুষের বিশ্বাস পরিবর্তন করা যায় না।
তার মতে, শক্তি প্রয়োগ করে মানুষের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট বিশ্বাস তৈরি করা সম্ভব নয়।
এদিকে সাবেক এক সংসদ সদস্যও সরকারকে নারীদের পোশাকের বদলে মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যা সমাধানে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে গিয়ে সরকার আবারও বড় ধরনের জনবিক্ষোভের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল, তার অভিজ্ঞতা এখনো ইরানের শাসকদের মনে রয়েছে।
বর্তমানে দেশটি একদিকে বিদেশি সংঘাত ও অর্থনৈতিক চাপ সামলাচ্ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে নারীদের পোশাক নিয়ে নতুন করে কঠোর অভিযান চালালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই আপাতত ইরান সরকার হিজাব আইন কতটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করবে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান চালিয়ে নতুন করে রাজপথে বিক্ষোভ সৃষ্টি করা, নাকি বর্তমান পরিস্থিতিকে কিছুটা সহনীয়ভাবে সামাল দেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে তেহরান।
সূত্র : সিএনএন, এএফপি
সময়ের আলো/ইউএমএইচ