কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা সব গাড়ি, ট্রাক ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর আগামী ১ জানুয়ারি থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর সোমবার (২৪ আগস্ট) ট্রাম্প এই হুমকি দেন। এর আগে দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। ওই চুক্তি হলে কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ি ও হালকা ট্রাকের ওপর মার্কিন শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশ হওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি কানাডার অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও ছিল।
তবে চুক্তির কয়েকটি বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে মাঝারি ও ভারী ট্রাকের ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে সমঝোতা হয়নি। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার আলোচনা ভেস্তে যায়।
এরপরই কানাডার ওপর আরও কঠোর অবস্থান নেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি তৈরি করলে কোনো শুল্ক দিতে হবে না। একই সঙ্গে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন তিনি।
ট্রাম্প আরও বলেন, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে কানাডার সঙ্গে কাজ করা কঠিন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কানাডাকে প্রয়োজন নেই, বরং কানাডারই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন।
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। গত বছর দুই দেশের মধ্যে পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৮৭২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কানাডা তার মোট রফতানি পণ্যের ৭৫ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছে। অন্যদিকে কানাডার মোট আমদানির প্রায় অর্ধেক এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
দুই দেশের গাড়ি শিল্পও পরস্পরের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে কানাডা ও মেক্সিকো থেকে যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হয়। ফলে কানাডার গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে শুধু কানাডাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
কানাডার অটোমোটিভ পার্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ফ্লাভিও ভলপে বলেন, কানাডার গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক আরোপ করা হলে এর প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি কারখানাগুলোতেই। কারণ এসব যন্ত্রাংশ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কারখানায় গাড়ি সংযোজনের কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে, ট্রাম্পের নতুন শুল্কের হুমকির জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডাও। ট্রাম্পের আরোপ করা ৫০ শতাংশ শুল্কের প্রতিক্রিয়ায় আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি শনিবার দুই দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে বাণিজ্যযুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কানাডার ওপর হামলা হয়েছে এবং সে কারণেই দেশটি পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে।
এই বাণিজ্য বিরোধের প্রভাব কানাডার গাড়ি শিল্পে ইতোমধ্যে দেখা দিতে শুরু করেছে। বেশ কয়েকটি বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কানাডায় তাদের উৎপাদন কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। কেউ কেউ আবার উৎপাদন কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এরই মধ্যে কানাডায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা গাড়ির পরিমাণ ২২ শতাংশ কমেছে।
ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণার বিষয়ে বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন গাড়ি শিল্পের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্কের হুমকি নিয়ে কিছুটা সংশয়ে রয়েছেন।
তাদের মতে, ট্রাম্প এর আগেও বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যার সবগুলো শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। তবে এবার সত্যিই ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে কানাডা বড় ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। এতে দুই দেশের গাড়ি শিল্প এবং সামগ্রিক বাণিজ্য আরও চাপে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক মাস পর জানুয়ারি থেকে শুল্ক কার্যকর করার হুমকি দেওয়ার পেছনে আলোচনায় ফিরে আসার কৌশলও থাকতে পারে। অর্থাৎ ট্রাম্পের এই চাপের উদ্দেশ্য হতে পারে কানাডাকে আবারও বাণিজ্য আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতেও কানাডার ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তখন কানাডায় তৈরি বোম্বার্ডিয়ার গ্লোবাল এক্সপ্রেস ব্যবসায়িক উড়োজাহাজের ওপর বিধিনিষেধ এবং কানাডায় তৈরি উড়োজাহাজের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলেছিলেন তিনি।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে দুই দেশের ব্যবসা, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ভোক্তা পর্যায়ে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ