বাংলাদেশ এমন একটি সংকটের প্রভাব ও বোঝা বহন করে চলেছে, যা বাংলাদেশ তৈরি করেনি। রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা, কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক মনোযোগ একটি বৃহত্তর কাঠামোর মাধ্যমে আসা উচিত। তাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হলে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে তাদের পরিচয়ের স্বীকৃতি দিতে হবে।
বাংলাদেশকে যেসব পরামর্শ বা প্রস্তাব দেওয়া হয়, সেগুলো মিয়ানমার সরকারকেও স্পষ্ট ভাষায় দেওয়া উচিত। রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক মাত্রা বিশিষ্ট একটি আঞ্চলিক মানব নিরাপত্তার সংকট হিসেবে মোকাবিলা করা উচিত। এই সংকটের প্রায় এক দশক পূর্ণ হওয়ার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমাদের বলতে হয়Ñ আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ববোধ যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া উচিত। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম দৈনিক সময়ের আলোকে এমন মন্তব্য করেন।
বিগত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সীমান্ত অতিক্রম করে মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাড়ে ৭ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ বাংলাদেশের একাধিক অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে আরও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরগুলোতে কমবেশি ১৩ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করছে। উল্লেখ্য এরও আগে গত ৮০ দশক থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা মিয়ানমারের জান্তার হাত থেকে তাদের জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় এবং বিগত ৮০ ও ৯০ দশকে দুই দফায় বেশকিছু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসিত হলেও এখনও ওই সময়ের কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়ে গেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক মানে ১০ বছর সত্যিই একটি দীর্ঘ সময়। রিফিউজি ক্যাম্পে বড় হতে থাকা একটি শিশুর জন্য ১০ বছর মানে তার পুরো শৈশব। একজন তরুণ বা তরুণীর জন্য এটি শিক্ষার সুযোগ হারানোর সময়। একটি পরিবারের জন্য এটি গৃহহীন থাকার একটি দশক, আর পুরো একটি জনগোষ্ঠীর জন্য এটি অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাসকারী একটি প্রজন্ম।
২০১৭ সালের সেই ব্যাপক অনুপ্রবেশের সময় থেকেই বাংলাদেশ তার সীমান্ত এবং হৃদয় উভয়ই উন্মুক্ত রেখেছে। ১২ লাখেরও বেশি বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। আজকের পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় উভয় আলোচনার মাধ্যমেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের একটি সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে। বাংলাদেশ আশ্রয় দিতে পারে, মানবিক সহায়তা দিতে পারে, তাদের মর্যাদা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশ একা এমন একটি সংকটের সমাধান করতে পারে না, যা বাংলাদেশ তৈরি করেনি। আমি একটি বিষয়ে একদম স্পষ্ট করে বলতে চাই মানবিক সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, তবে এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আমাদের অন্যান্য বন্ধু ও অংশীদার দেশগুলো যে অবদান রাখছে, তাকে আমরা গভীরভাবে মূল্যায়ন করি। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই এর টেকসই সমাধানও চূড়ান্তভাবে মিয়ানমারেই খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো রাখাইন রাজ্য অর্থাৎ তাদের নিজস্ব জন্মভূমিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। এটি কেবল কোনো কূটনৈতিক পছন্দ নয়, এটিই সামনে এগোনোর একমাত্র টেকসই পথ।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, প্রথমত মানবিক ব্যবস্থাপনা এবং স্থায়ী সমাধানের মধ্যে আমাদের স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং ইতিপূর্বেই ভঙ্গুর পরিস্থিতির আরও অবনতি রোধ করার জন্য মানবিক সহায়তা অপরিহার্য। কিন্তু যেসব রাজনৈতিক, আইনি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এই বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে, মানবিক সহায়তা সেগুলোর সমাধান করতে পারে না। এই বাস্তুচ্যুতি যত দীর্ঘায়িত হবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে।
বাংলাদেশের জন্য মূল উদ্দেশ্য শুধু বাস্তুচ্যুতির কষ্ট বা সংকট সামলানো নয়, বরং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন সম্ভব করে তোলা। দ্বিতীয়ত একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন কাঠামোর একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়াকে বুঝতে হবে। বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার পক্ষের মধ্যে ইতিমধ্যেই গৃহীত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে একটি কার্যকর ও দ্রুত যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব আমরা স্বীকার করেছি।
কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা হলো এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি কালক্ষেপণ ও বিলম্ব করার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালের গণপ্রস্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত যে পরিবর্তনগুলো এসেছে যেমন ক্যাম্পে জন্মগ্রহণকারী শিশু এবং রাখাইন থেকে নতুন করে আসা জনগোষ্ঠীকে তথ্য যাচাইয়ের এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাই আমরা তথ্য যাচাইকরণকে দুটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখছি : প্রথমত প্রত্যাবাসনের জন্য প্রকৃত তথ্যের ভিত্তি তৈরি করা এবং দ্বিতীয়ত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আস্থা অর্জনের পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করা। তৃতীয়ত টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করা।
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আদি অধিবাসী একটি জনগোষ্ঠী। তাই তাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হলে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে তাদের পরিচয়ের স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের যদি ‘বিদেশি’ বা ‘বাঙালি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক, সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ককে অস্বীকার করা হয়, যার ফলে যেকোনো সমাধান বা উদ্যোগই অকার্যকর ও অটেকসই হয়ে পড়ে। চতুর্থত আন্তর্জাতিক সাড়াদানকে কেবল ‘বোঝা ভাগ করে নেওয়া’ থেকে বাড়িয়ে ‘দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার’ দিকে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ এমন একটি সংকটের অসম পরিমাণ প্রভাব ও বোঝা বহন করে চলেছে, যা বাংলাদেশ তৈরি করেনি।
তাই আন্তর্জাতিক সহায়তা কেবল মানবিক সহায়তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বরং উন্নয়ন সহায়তা, কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক মনোযোগের একটি বৃহত্তর কাঠামোর মাধ্যমে আসা উচিত। আর বাংলাদেশকে যেসব পরামর্শ বা প্রস্তাব দেওয়া হয়, সেগুলো মিয়ানমার সরকারকেও স্পষ্ট ভাষায় দেওয়া উচিত। পঞ্চমত রোহিঙ্গা সংকটের জন্য প্রকৃতপক্ষে একটি সুসমন্বিত আন্তর্জাতিক কাঠামোর প্রয়োজন। কোনো একক পক্ষের পক্ষে এই সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ বজায় রাখবে।
একই সঙ্গে জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সংস্থা ও দেশগুলো, আসিয়ান, উন্নয়ন সহযোগী এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভূমিকা পালনের কথা রয়েছে। এই সংকটের প্রভাব কেবল বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বঙ্গোপসাগর, আসিয়ান এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। তাই চ্যালেঞ্জ হলো এটি নিশ্চিত করা যে, সব উদ্যোগ যেন খণ্ডিত না হয়ে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক মাত্রাবিশিষ্ট একটি আঞ্চলিক মানব নিরাপত্তার সংকট হিসেবে মোকাবিলা করা উচিত। এই সংকটের প্রায় এক দশক পূর্ণ হওয়ার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমাদের বলতে হয়- আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ববোধ যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া উচিত।
নীতি গবেষণা কেন্দ্রের আয়োজনে ‘রোহিঙ্গা সংকট : বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় গত রোববার রোহিঙ্গা নারী অধিকারকর্মী রাজিয়া সুলতানা বলেন, রোহিঙ্গা নারীরা তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চায়। বাংলাদেশ অনেক করেছে কিন্তু একা আর কত বহন করবে। রোহিঙ্গারা নিজের দেশে ফিরতে চায়, কিন্তু সেটা হতে হবে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন। এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে, কারণ ৯টা বছর পার হয়ে গেছে।
নীতি গবেষণাকেন্দ্রের আয়োজনে ওই আলোচনা অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা প্রতিনিধি মুজিবুল্লাহ বলেন, আমরা কোনো সহানুভূতি চাই না, আমরা বিচার চাই এবং আমাদের অধিকার চাই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে