রাজধানী ঢাকাবাসীর আতঙ্কের নাম হাম। একদিকে হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, অন্যদিকে বর্ষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। ফলে একই সময়ে দুই রোগের চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন নগরবাসী। বিশেষ করে শিশুদের হাম এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অনেকে।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর সরকার দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম শুরু করলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বাইরে বের হলে মশার কামড়ের ভয়, আর বাড়িতে শিশু থাকলে হামের আশঙ্কা- দুই ধরনের উদ্বেগই ঘিরে আছে নগরবাসীকে।
জ্বর হলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন স্বজনরা। ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মশকনিধন কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত হলেও ডেঙ্গুর মৌসুমে কেন বারবার এডিস মশার বিস্তার ঘটে এ প্রশ্নও উঠছে।
ডেঙ্গু ও হাম দুটি রোগের চরিত্র আলাদা হলেও একই সময়ে সংক্রমণ বাড়ায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। একদিকে ঘরে শিশুকে হামের হাত থেকে রক্ষার উদ্বেগ, অন্যদিকে দিন-রাত এডিস মশার উৎপাত- সব মিলিয়ে রাজধানীবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এক দিনে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ৯৯৪ ভর্তি : সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৯৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী ভর্তির নতুন রেকর্ড। এ সময়ে মারা গেছেন আরও তিনজন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আগস্ট মাসেই মারা গেছেন ৩১ জন। এ ছাড়া জুলাইয়ে ৩৬, জুনে ১৩, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে মারা যান।
চলতি বছরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৯২৩ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৮৬২ জন। এ নিয়ে এই পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ২৭ হাজার ৭৫৮ জন। নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৮১ জন ঢাকা বিভাগে। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ২১৫, বরিশালে ১১৭, চট্টগ্রামে ১০৭, ময়মনসিংহে ৭১ এবং রাজশাহী বিভাগে ৭৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
হামে ৯৩৮ মৃত্যু : স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া এক বার্তায় বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর দেশে হাম ও হামের উপসর্গে এ পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩৮ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ৯৯ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৮৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে তিনজন এবং সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। একই সময়ে ৮৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১৮ হাজার ৪৮৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১ হাজার ১৪৯ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এতে মোট সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৫২ জনে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, টায়ার, ড্রেন ও জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু এ অব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কেন পুরোপুরি সফল হচ্ছে না, সে প্রশ্নও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মশকনিধন কর্মসূচি চালালেই হবে না। কোন এলাকায় রোগী বাড়ছে, কোথায় লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে এবং কোন হটস্পটে সংক্রমণ বেশি- এসব তথ্যের ভিত্তিতে এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দ্বৈত চাপ : স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের পরিস্থিতিও স্বাস্থ্য খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাম ও ডেঙ্গুর এই ‘দ্বৈত চাপ’ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় আগে থেকেই ব্যবহৃত রাজধানীর বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন হামের রোগীকেও সামলাতে হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু রোগী দ্রুত বাড়তে থাকলে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য চিকিৎসা সুবিধার ওপর বাড়তি চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা হামের অন্যতম বড় কেন্দ্র। ঢাকায় ঘনবসতিপূর্ণ ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে সংক্রমণ বেশি দেখা গেছে। হাম প্রধানত শিশুদের আক্রান্ত করছে। অন্যদিকে ডেঙ্গুতে শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে একই পরিবারের একাধিক সদস্য ভিন্ন ভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
আগস্টের হাসপাতালে ভর্তির তথ্যেও পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। আগস্টের প্রথম ২১ দিনে হাম বা হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে ১৮ হাজার ৫৯৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৮৫ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের ক্ষেত্রে টিকাদান কর্মসূচি আরও কার্যকর করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শিশুদের শনাক্ত করে টিকা নিশ্চিত করা এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। আর ডেঙ্গু মোকাবিলায় ডিএনসিসি ও ডিএসসিসিকে নিয়মিত মশার লার্ভা শনাক্ত ও ধ্বংস, হটস্পটভিত্তিক অভিযান এবং নির্মাণাধীন ভবন ও পরিত্যক্ত স্থাপনায় নজরদারি বাড়াতে হবে।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত এবং ডেঙ্গু হটস্পট ব্যবস্থাপনার ওপর পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় এডিস মশার প্রজনন শুরু হয়েছে, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণ জ্যামিতিক হারে বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর উৎপত্তিস্থল বা হটস্পটগুলো পাড়া-মহল্লা পর্যায়ে চিহ্নিত করে সেখানে দ্রুত মশা নিধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। মশা নিধন অভিযান জোরদার, সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা এবং সচেতনতামূলক প্রচার চালানো জরুরি।
মশকনিধন কার্যক্রম চলছে, ডিএসসিসি : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, মশকনিধন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডেঙ্গুবাহী মশার প্রাদুর্ভাব বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময়ে এডিস মশার সংখ্যা বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ওয়ার্ডভিত্তিক জরিপ করা হয়েছে এবং কিছু এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগে মশকনিধন অভিযান চলছে। একই সঙ্গে বায়োলজিক্যালভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে- কোথায় মশার উপদ্রব ও প্রজনন বেশি এবং এর কারণ কী, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইমদাদুল হক বলেন, মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসির মশকনিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়েছে। ড্রেনেজ, স্যুয়ারেজ, লেক ও খাল পরিষ্কার এবং মশার ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রমও চলছে। তিনি বলেন, অনেক এলাকায় খোলা নর্দমা, স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। এতে মশার বংশবিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। সম্ভাব্য ডেঙ্গু রোগী বৃদ্ধির কথা বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হামের টিকাদানে জোর : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার খসরু পারভেজ বলেন, দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাবে প্রায় হাজারের কাছাকাছি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা গভীর উদ্বেগের। হাম শুধু একটি ভাইরাসের আক্রমণ নয়; এটি অপুষ্টি, অনাক্রম্যতার দুর্বলতা এবং দ্বিতীয় সংক্রমণের যৌথ ফল হতে পারে। তিনি বলেন, হামের লক্ষণ দেখা মাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া এবং অপুষ্ট শিশুদের বিশেষ পুষ্টি নিশ্চিত করা উচিত। যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম বা অপুষ্টি বেশি, সেখানে বাদ পড়া শিশু ও নারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত সম্পূরক টিকাদানের আওতায় আনতে হবে।
জ্বর ও র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে শিশুকে হাসপাতালে নেওয়া এবং আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা প্রয়োজন, যাতে অন্য শিশুরা সংক্রমিত না হয়। সন্তান নেওয়ার আগেই নারীদের শরীরে অ্যান্টিবডি আছে কি না তা নিশ্চিত করা এবং বাদ পড়া তরুণীদের হামের টিকা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি জানান।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেছেন, টিকাদান কার্যক্রম চলমান থাকলে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব কমে আসবে। দীর্ঘদিনের সমস্যা এক দিনে বা সামনের সপ্তাহে ‘ম্যাজিকের মতো’ সমাধান হয়ে যাবে না।
টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি ও মাঠ পর্যায়ে টিকাদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট ছিল। তিনি বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত টিকাদান শুরু করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাঠকর্মীরা দ্বিগুণ কর্মশক্তি দিয়ে কাজ করেছেন। ৪০ হাজার মাঠকর্মীর প্রয়োজনের বিপরীতে মাঠে ছিলেন ২৫ হাজার। এর মধ্যেই তারা এক মাসে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দিয়েছেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে