ঝিনাইদহের একটি রেস্তোরাঁয় বসে দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন ইমাল মোহাম্মদী। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে ভাইয়ের মুখ। দূর আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশে এসেছেন একটাই আশায়— কবর থেকে ভাইয়ের মরদেহ তুলে নিজ দেশে নিয়ে যাবেন, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শেষবারের মতো দাফন করবেন। কিন্তু প্রায় ৫০ দিন ধরে সেই অপেক্ষারই যেন শেষ হচ্ছে না।
প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র, ডিএনএ পরীক্ষার নথি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চিঠি— সবই রয়েছে ইমালের কাছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও মরদেহ উত্তোলন ও আফগানিস্তানে পাঠানোর বিষয়ে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে। তবু একটি আনুষ্ঠানিক চিঠির অপেক্ষায় থেমে আছে পুরো প্রক্রিয়া। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না পাওয়ায় এখনো কবর থেকে তোলা যাচ্ছে না হাসমত মোহাম্মদীর মরদেহ।
গত ১৩ এপ্রিল। ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে একটি অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবি। পরিচয় শনাক্তের জন্য মরদেহের আঙুলের ছাপ নিয়ে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারে অনুসন্ধান চালায় পিবিআই। কিন্তু কোনো তথ্য মেলেনি।
পরিচয় না মেলায় পরদিন, গত ১৪ এপ্রিল আনজুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে মরদেহটি ঝিনাইদহ পৌর কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় মহেশপুর থানায় অপমৃত্যুর মামলাও করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন পর বদলে যায় পুরো গল্প।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত মরদেহের ছবি দেখে আফগানিস্তান থেকে স্বজনেরা বুঝতে পারেন, অজ্ঞাত সেই ব্যক্তি আর কেউ নন— তাদের পরিবারের সদস্য হাসমত মোহাম্মদী। আফগানিস্তানের কাবুলের পাঞ্জশির এলাকার কুন্ডুস গ্রামের ইয়াসিন মোহাম্মদী ও সকিনা মোহাম্মদীর ছেলে ছিলেন তিনি।
ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে লন্ডনপ্রবাসী মীর ওয়াইস মোহাম্মদী বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন। চেষ্টা করেছিলেন ভাইয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার। কিন্তু আইনি জটিলতায় সেই চেষ্টা সফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরে যেতে হয়। এরপর দাফনের চার মাস ২৪ দিন পর, গত ২৪ আগস্ট আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসেন আরেক ভাই ইমাল মোহাম্মদী। সঙ্গে নিয়ে আসেন ডিএনএ পরীক্ষার নথি, পরিচয়পত্র, মন্ত্রণালয়ের চিঠিসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র। কিন্তু কাগজপত্র হাতে নিয়েও থামেনি অপেক্ষা।
হাসমতের বাংলাদেশি আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান মাসুম জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন শাখা-১-এর উপসচিব কাজী আরিফুর রহমান গত ১১ আগস্ট পররাষ্ট্রসচিব, ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে চিঠি দেন। চিঠিতে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে আফগানিস্তানে পাঠানোর বিষয়ে অনাপত্তি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
তবে জেলা প্রশাসনের ভাষ্য, হাসমত যেহেতু বিদেশি নাগরিক, তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠির পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক নির্দেশনাও প্রয়োজন। সেই চিঠি না আসায় আটকে আছে মরদেহ উত্তোলনের প্রক্রিয়া।
ঝিনাইদহের একটি রেস্তোরাঁয় বসে ইমাল বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তার ভাইয়ের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের চাওয়া খুব সামান্য— ভাইয়ের মরদেহটি নিজ দেশে নিয়ে গিয়ে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন করা। কিন্তু সেই শেষ ইচ্ছাটুকুও পূরণ করতে পারছেন না তিনি।
এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে ঘুরতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ইমাল। দূর দেশ থেকে এসে দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন শুধু একটি অনুমতির জন্য— যে অনুমতি মিললেই হয়তো কবরের মাটি সরিয়ে ভাইয়ের মরদেহটি তুলে নিতে পারবেন।
আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মাসুম বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে। এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার অপেক্ষা চলছে। মানবিক দিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক নোমান হোসেনও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেলে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।’
সময়ের আলো/কেএইচ