যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা অঙ্গরাজ্যে পারিবারিক নৈশভোজে গুলি চালিয়ে চার শিশুসহ আট স্বজনকে হত্যা করেছেন এক ব্যক্তি। পরে ওই ব্যক্তি আত্মঘাতী গুলিতে আহত হয়ে মারা যান।
রোববার সন্ধ্যায় বিলিংস শহরের বাইরে একটি বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা একই বর্ধিত পরিবারের চার প্রজন্মের সদস্য। তাদের বয়স ৭ বছর থেকে ৯০ বছরের বেশি।
পরিবারের সদস্য ব্র্যাড আয়ারল্যান্ডের বরাত দিয়ে এপি জানিয়েছে, হামলাকারীর নাম ৪৪ বছর বয়সী অ্যালান স্মিথ। তার বাবা-মা কয়েক সপ্তাহ আগে তাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেছিলেন। তবে রোববার পারিবারিক নৈশভোজের সময় তিনি হঠাৎ ওই বাড়িতে ফিরে এসে গুলি চালান।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন অ্যালান স্মিথের দাদি, বাবা-মা, ছোট বোন এবং চার শিশু।
রোববার সন্ধ্যায় পুলিশ ওই বাড়িতে গিয়ে পেছন দিক থেকে গুলির শব্দ শুনতে পায়। এর কিছুক্ষণ পর পুরো বাড়িতে আগুন ধরে যায়।
মঙ্গলবার তদন্তকারীরা নিশ্চিত করেন, ঘটনায় আটজন নিহত হয়েছেন। সন্দেহভাজন হামলাকারী নিজেকেও গুলি করেছিলেন এবং পরে তার মৃত্যু হয়।
আগুনে বাড়িটি পুরোপুরি পুড়ে ভিত্তি পর্যন্ত ধসে যাওয়ায় ঘটনাস্থল তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিলিংস পুলিশ বিভাগের মুখপাত্র জেফ স্টোভাল।
বিলিংস ফায়ার বিভাগের প্রধান ম্যাট হোপেলের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাত ১টা পর্যন্ত আগুন নেভানোর কাজ চলে। বাড়িটি শহরের সীমানার বাইরে এমন একটি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত, যেখানে অগ্নিনির্বাপণের জন্য পানির হাইড্র্যান্ট থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দমকলকর্মীরা আগুনের কাছে যেতে পারেননি। ফলে আগুন পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে।
নিহতদের মধ্যে অ্যালান স্মিথের বোন মেগান ঘেকিয়ের এবং তার দুই সন্তান ১৩ বছরের ওভেন আয়ারল্যান্ড ও ৭ বছরের ক্লোয়ি আয়ারল্যান্ড রয়েছে।
এ ছাড়া মেগানের বর্তমান স্বামী অ্যাডাম ঘেকিয়েরের দুই সন্তান ১৫ বছরের ল্যান্ডন ঘেকিয়ের এবং ১২ বছরের শার্লট ঘেকিয়েরও নিহত হয়েছে।
পরিবারের বন্ধু ও প্রতিবেশী জেনিফার মার্সার বলেন, শার্লটই ছিলেন ‘নায়ক’। গুলির মধ্যে তিনি জরুরি নম্বরে ফোন করে পরিবারকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন।
মার্সার বলেন, পরিবারটি ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ভালোবাসাপূর্ণ। শিশুরাও একে অপরের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখত এবং বিবাহবিচ্ছেদের পরও তাদের বাবা-মায়ের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল।
স্মিথ পরিবার মূলত ওয়াশিংটনের সিয়াটল এলাকার বাসিন্দা। ব্র্যাড আয়ারল্যান্ড জানান, প্রায় ছয় বছর আগে মেগান ঘেকিয়েরের সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদের পর মেগান সন্তানদের নিয়ে মন্টানায় চলে যান। সেখানে তার পরিচয় হয় অ্যাডাম ঘেকিয়েরের সঙ্গে।
পরে মেগানের বাবা-মা ডানা ও বার্ব স্মিথও মন্টানায় চলে আসেন এবং মেয়ের বাড়ির কাছেই বিলিংসে একটি বাড়ি কেনেন। পরিবারের প্রবীণ সদস্য ইভলিন স্মিথ কাছের একটি অবসরকালীন আবাসনে থাকতেন।
অ্যালান স্মিথও মন্টানায় বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করতেন। কয়েক বছর তাদের সঙ্গে থাকার পর সম্প্রতি তাকে বাড়ি ছেড়ে যেতে বলা হয়। তবে রোববার সন্ধ্যায় পরিবারের সাপ্তাহিক নৈশভোজের সময় তিনি সেখানে ফিরে আসেন।
আয়ারল্যান্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যালান স্মিথ তার দাদি, বাবা-মা, ছোট বোন ও চার শিশুকে হত্যা করার পর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে পালানোর চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখোমুখি হন তিনি।
আয়ারল্যান্ড বলেন, অ্যালান স্মিথ অনেকটা ‘নিঃসঙ্গ’ জীবনযাপন করতেন। দিনের বেশির ভাগ সময় নিজের ঘরে কম্পিউটার নিয়ে থাকতেন।
তিনি বলেন, ‘অনেক সতর্কসংকেত ছিল এবং অনেকেই এ নিয়ে কথা বলেছিলেন। কিন্তু কেউ শোনেনি।’
অ্যালান স্মিথ ইস্টার্ন ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছিলেন। তবে নিয়মিত চাকরি খুঁজে পাওয়া বা ধরে রাখা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
মন্টানা ও ওয়াশিংটনের অপরাধসংক্রান্ত নথি যাচাই করে তার বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তার বা ফৌজদারি মামলার তথ্য পাওয়া যায়নি। আয়ারল্যান্ডের মতে, অ্যালান আগে কখনো সহিংস আচরণ করেননি, যদিও তিনি মৌখিকভাবে নির্যাতনমূলক আচরণ করতেন।
বিলিংস বিমানবন্দরে কাজ করা অ্যাডাম ঘেকিয়ের রেডিওতে সক্রিয় বন্দুক হামলার খবর শুনে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে ফোন করেন। এরপর দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বাড়িটির দিকে ছুটে যান।
সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান বাড়িটি আগুনে জ্বলছে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর জানতে পারেন, তার স্ত্রী ও সন্তানরা নিহত হয়েছেন।
অ্যাডাম বলেন, পারিবারিক নৈশভোজ সাধারণত শুক্রবার হতো। তাই সেদিন তার সন্তানদের সেখানে থাকার কথা ছিল না।
ভগ্নিপতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না, সে আমার সন্তানদের সেখানে থাকার কথা ভেবেছিল। সে যা করেছে, তা বর্ণনা করার জন্য “দানব” শব্দটিও যথেষ্ট নয়।’
পুলিশ তাকে নিশ্চিত করেছে, তার ১২ বছরের মেয়ে শার্লটই বাড়ির ভেতর থেকে জরুরি নম্বরে ফোন করেছিল।
অ্যাডাম বলেন, মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথোপকথনের কথা বারবার মনে পড়ছে—তিনি যখন বলতেন ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, শার্লট জবাব দিত, ‘আমি তোমাকে আরও বেশি ভালোবাসি।’
এপি, ইউএসএ টুডে ও নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির যৌথভাবে পরিচালিত একটি তথ্যভান্ডারের হিসাবে, মন্টানার এই হামলা চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ২২তম গণহত্যার ঘটনা।
এর মধ্যে ১৫টি ঘটনার পেছনে পারিবারিক বিরোধ ছিল। নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অপরাধবিজ্ঞানী জেমস অ্যালান ফক্স বলেন, সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত গণহত্যার প্রায় অর্ধেকের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের সম্পর্ক থাকে।
এপ্রিল মাসে লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে এক বাবা আট শিশুকে গুলি করে হত্যা করেন। নিহতদের মধ্যে তার নিজের সাত সন্তানও ছিল। ওই ঘটনায় স্ত্রীসহ আরও এক নারী আহত হন। এরপর এটিই যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে প্রাণঘাতী গুলির ঘটনা বলে জানিয়েছে এপি।
সময়ের আলো/কেএইচ