হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কয়েক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছাচ্ছে বিকল্প পথে। ওমান উপসাগরে এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালির অংশ এড়িয়ে যাচ্ছে ট্যাংকারগুলো।
বুধবার সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্র্যাকার্স জানায়, ওমান উপসাগরে অন্তত ১৫টি জাহাজে একসঙ্গে তেল স্থানান্তরের কার্যক্রম চলছিল। এসব কার্যক্রমে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি রয়েছে। ইরান ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় সব দেশ থেকেই এসব পণ্য এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী এক আপডেটে একটি ইরানি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের চালানও এমন স্থানান্তর কার্যক্রমে যুক্ত থাকার কথা জানানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ এড়িয়ে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখতে জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। ছোট দূরত্বের ‘শাটল’ যাত্রার পাশাপাশি কিছু জাহাজ স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা এআইএস বন্ধ রেখে চলাচল করছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র দুটি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। এর মধ্যে একটি ছিল বড় গ্যাসবাহী জাহাজ এবং অন্যটি বিশাল অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার। মে মাসের শুরুর পর এটি ছিল এক দিনে সবচেয়ে কম জাহাজ চলাচলের ঘটনা। সাম্প্রতিক ১০ দিনের দৈনিক গড় প্রায় ১৪টির তুলনায় সংখ্যাটি অনেক কম।
তবে কিছু জাহাজ এআইএস ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে চলাচল করায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সময়ের আলো/কেএইচ
ভর্টেক্সার প্রাথমিক তথ্য বলছে, সোমবার হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সাত দিনের গড় হিসাবে এই প্রবাহ ছিল প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ ব্যারেল।
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হতো। তখন প্রতিদিন সাধারণত ৯৫ থেকে ১৩০টি জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করত।
মার্চের শুরুতে ইরান জলপথে চলাচল সীমিত করার পর পণ্যবাহী জাহাজের গড় চলাচল নেমে আসে দিনে প্রায় ১০টিতে। জুনের অন্তর্বর্তী সমঝোতার সময় তা সাময়িকভাবে বেড়ে প্রায় ৩৬টিতে উঠেছিল। জুলাইয়ে আবার সংঘাত শুরু হলে চলাচল কমে দিনে প্রায় ১৫টিতে স্থির হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী অনেক জাহাজ ‘ডার্ক’ বা অজ্ঞাত হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় প্রকৃত পরিস্থিতি নিরূপণ কঠিন হয়ে পড়েছে। ইরান তাদের নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গ করেছে দাবি করে কয়েক ডজন তেলবাহী ট্যাংকারকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এসব জাহাজের সঙ্গে জাহাজে-জাহাজে তেল স্থানান্তরে যুক্ত ট্যাংকারগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান।
হরমুজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ এড়িয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছে যাওয়ার বিপরীতে ইরানের তেল রপ্তানি এখনো চাপে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নিয়ন্ত্রিত রুটের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে অন্য দেশগুলোর তেল বাজারে পৌঁছানো তেহরানের হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সামরিক পাহারা ও বিভিন্ন অভিযান হরমুজ বন্ধ করার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা সীমিত করেছে। তবে ইরান এখনো প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে দাবি করছে এবং একতরফা মার্কিন পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে।
হরমুজ দিয়ে সরাসরি তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কমে গেলেও বিকল্প পথে সরবরাহ অব্যাহত থাকায় বিশ্ববাজার পরিস্থিতির সঙ্গে কিছুটা মানিয়ে নিয়েছে। তবে হামলা বা সামরিক তৎপরতা আরও বাড়লে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সময়ের আলো/কেএইচ