নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণ, ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল এবং সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে জোরপূর্বক দেহব্যবসায়ে বাধ্য করার মতো ঘটনা সামনে এসেছে। নির্যাতনের শিকার ওই কিশোরী বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় এক বিএনপি নেতাসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে কেন্দুয়া থানায় মামলা করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠিয়েছে। অন্যদিকে, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রধান অভিযুক্ত কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সহ-সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বকুলকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বহিস্বারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর আগে, বুধবার (২৬ আগস্ট) রাতে বকুল মিয়াকে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি প্রদানের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছেন কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সভাপতি খোকন আহমেদ ডিলার ও সাধারণ সম্পাদক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকার কারণে রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বকুলকে কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ৫নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদ এবং জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী কিশোরী কেন্দুয়া পৌর শহরের একটি স্বনামধন্য বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত, তখন থেকেই তার ওপর এই অমানবিক নির্যাতন শুরু হয়। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর দুপুর অনুমান ২টার দিকে পায়ে ঘা হওয়ার চিকিৎসার কথা বলে প্রধান আসামি, সম্পর্কে কিশোরীর খালু, রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বকুল (৫৫) তাকে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস রোডের অজ্ঞাত বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয় এবং সুকৌশলে মোবাইল ফোনে সেই দৃশ্য ধারণ করে রাখা হয়।
পরবর্তীতে ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে আসামি বকুল নিজ বসতঘরেই ওই কিশোরীকে একাধিকবার ধর্ষণ করে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, জঘন্য এই কাজে বকুলের স্ত্রী মোছা. জাহানারা বেগম (৪৮) এবং মেয়ে মোছা. লিমা (২১) পরোক্ষভাবে সহায়তা করত এবং লিমাই কিশোরীকে ডেকে আনত।
নির্যাতনের মাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। প্রধান আসামি বকুলের নির্দেশে কিশোরীকে আরও ভয়ংকর জগতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। মামলার আরেক আসামি মো. আবু মিয়ার (৫০) বসতঘরের খাটে কিশোরীর মুখে স্প্রে মেরে অজ্ঞান করে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এরপর আবু মিয়া তাকে জোরপূর্বক ট্যাবলেট জাতীয় ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করত। পাশাপাশি, বকুলের নির্দেশনায় মোছা. স্মৃতি (৩২) নামের আরেক নারীর সঙ্গে কিশোরীকে যেতে বাধ্য করা হতো। স্মৃতি তাকে বিভিন্ন অজ্ঞাত ভাড়াবাসায় নিয়ে জোরপূর্বক দেহব্যবসায় বাধ্য করত এবং সেখানে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা তাকে ধর্ষণ করত।
ঘটনাটি প্রকাশ করলে কিশোরী ও তার বাবাকে খুন করে মরদেহ পানির ট্যাংকিতে গুম করা এবং এসিড মেরে মুখ ঝলসে দেওয়ার মতো ভয়ানক হুমকি দেওয়া হতো। প্রাণভয়ে ওই কিশোরী এতদিন মুখ খুলতে সাহস পায়নি।
দীর্ঘদিন ধরে চলা পাশবিক নির্যাতনের ঘটনাটি সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসে। চলতি মাসের ১ আগস্ট কিশোরী চট্টগ্রামে তার বড় ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে গেলে ধারণকৃত ওই আপত্তিকর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইয়ের জেরার মুখে ভেঙে পড়ে কিশোরী এবং তার ভাবির কাছে ঘটনার বিস্তারিত খুলে বলে। পরবর্তীতে চট্টগ্রামে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হলে জানা যায়, ভুক্তভোগী কিশোরী ইতোমধ্যেই ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে কেন্দুয়া থানায় এজাহার দায়ের করেছেন। মামলায় রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বকুলকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্যান্য আসামিরা হলেন, মো. আবু মিয়া, বকুলের স্ত্রী জাহানারা বেগম, মেয়ে লিমা ও মোছা. স্মৃতি। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।
কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, একজনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদের আটকের চেষ্টা চলছে।
সময়ের আলো/জোই