ছয় মাসেও শেষ হয়নি ইরান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বাড়ছে সংকটের ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধ ছয় মাসে গড়িয়েছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, কয়েক সপ্তাহের

2026-08-28T12:05:59+00:00
2026-08-28T12:05:59+00:00
 
  শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ছয় মাসেও শেষ হয়নি ইরান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বাড়ছে সংকটের ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৫ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধ ছয় মাসে গড়িয়েছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংঘাত শেষ হয়ে যাবে। সময় যত গড়াচ্ছে, যুদ্ধের প্রভাবও তত ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে।

সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর এবং কোরীয় উপদ্বীপের মতো সম্ভাব্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল ইরানের পূর্ণ আত্মসমর্পণ, সরকার পরিবর্তন এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করা। পরে সেই লক্ষ্য বদলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সীমিত করার দাবিতে এসে ঠেকেছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন অন্য সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংকটগুলোর দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। এর ফলে প্রতিপক্ষ দেশগুলো পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইউক্রেন ও রাশিয়ায় প্রভাব
ইরানের পাল্টা হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত কিছু গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চলতি মাসে সিএনএনকে জানিয়েছেন, রাশিয়ার ব্যাপক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে যতটা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক প্রয়োজন, তার মাত্র ১০ শতাংশ তাদের হাতে রয়েছে।

এরই মধ্যে ইউক্রেনে রুশ হামলায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যাও বেড়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি গ্রীষ্ম ২০২২ সালের মে মাসের পর দেশটির বেসামরিক মানুষের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী সময় হয়ে উঠেছে।

ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটও তৈরি হয়েছে। এতে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির মার্কিন প্রচেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর থাকা কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। এর ফলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে রাশিয়ার আরও অর্থ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে তেল, গ্যাস ও সার বাণিজ্যে বৈশ্বিক বিঘ্নের কারণে রাশিয়া নতুন ক্রেতা খুঁজে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের পরিচালক আলেক্সান্ডার গাবুয়েভ বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রাশিয়ার যোগাযোগও বেড়েছে।

তবে ইরান যুদ্ধের কিছু ইতিবাচক প্রভাব ইউক্রেনের ওপরও পড়েছে। দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময়ের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইউক্রেন ড্রোন প্রযুক্তিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও গোলাবারুদ সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও পেয়েছে দেশটি।

কোরীয় উপদ্বীপেও উদ্বেগ
ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে কোরীয় উপদ্বীপেও। দক্ষিণ ও উত্তর কোরিয়া ১৯৫০-৫৩ সালের যুদ্ধের পর আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি না হওয়ায় এখনো কারিগরিভাবে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। তবে চলতি বছর ওয়াশিংটন ও সিউলের দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতায় কিছুটা ছন্দপতন হয়েছে। ইরান যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার সমর্থন না থাকার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির সঙ্গে বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক মহড়া কমিয়ে দেওয়ার ফলে স্বল্পমেয়াদে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও সক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব বাহিনীর ওপর যুদ্ধকালীন নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রস্তুতিও বিলম্বিত হতে পারে।

এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। পেন্টাগন ঠিক কতটি ব্যবস্থা সরিয়েছে, তা প্রকাশ করেনি। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, প্যাট্রিয়টের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর
ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় সামরিক উপস্থিতিতেও প্রভাব পড়েছে। জাপানভিত্তিক মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে আরব সাগরে পাঠানো হয়েছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত করতে।

এর ফলে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে ওই অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বিশেষ করে ফিলিপাইন উদ্বিগ্ন হতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে। বিতর্কিত স্কারবরো শোল ও সেকেন্ড থমাস শোলকে ঘিরে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে উত্তেজনাও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। ফলে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা সংঘাতে রূপ নিলে ওই অঞ্চলে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর অনুপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিকভাবে অসুবিধাজনক হতে পারে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এমিলি হার্ডিং বলেন, চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের ঘাটতি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

অন্য নৌপথও কি ঝুঁকিতে?
ইরান যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব হতে পারে আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তায়। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা অন্য দেশগুলোকে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে রাজনৈতিক বা সামরিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের দৃষ্টান্ত দেখাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

হার্ডিংয়ের মতে, এখনো এমন কোনো ঘটনা দেখা যায়নি। তবে ভবিষ্যতে কোনো দেশ চাইলে হরমুজের ঘটনাকে নজির হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রভাব কতটা গুরুতর হবে, তা মূলত নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র কতদিন এই সংঘাতে জড়িয়ে থাকবে তার ওপর।

ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করাকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ফল হিসেবে বিবেচনা করে এবং ইসরায়েলের প্রত্যাশা অনুযায়ী ইরানকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল ও বিভক্ত করার লক্ষ্য ধরে রাখে, তাহলে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিকেও দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হতে পারে।

তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পুরোপুরি ধ্বংস না করে শুধু ‘ব্যবহারের অযোগ্য’ করে রাখাকেও যদি যথেষ্ট মনে করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল পথে এগোতে পারে বলে মনে করেন হার্ডিং।

তার মতে, ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এখন মূল লক্ষ্য টিকে থাকা। আর সেটি তারা পারছে বলেই সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।


সময়ের আলো/কেএইচ


  বিষয়:   সময়ের আলো  ইরান  যুক্তরাষ্ট্র 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: