তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিতে কেন এত আগ্রহী ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে জোরালো চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার অংশ হিসেবে

2026-08-28T09:12:43+00:00
2026-08-28T09:19:43+00:00
 
  শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বিবিসির প্রতিবেদন
তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিতে কেন এত আগ্রহী ভারত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৯:১২ এএম  আপডেট: ২৮.০৮.২০২৬ ৯:১৯ এএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে জোরালো চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার অংশ হিসেবে দিল্লির এই উদ্যোগ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এখনো সফরের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

চলতি মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পাঠানো একটি ই-মেইল ঘিরে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এতে জানানো হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি ভবনে সাপ্তাহিক ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। কারণ, সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে।

সমস্যা ছিল, তারেক রহমানের দিল্লি সফরের বিষয়ে তখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ই-মেইলটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে এর মধ্যেই বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে চলা কয়েক সপ্তাহের জল্পনা আরও জোরালো হয়।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএম সালেহ বিবিসিকে বলেন, ‘সফরের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’

তারেক রহমানের দিল্লি সফর হলে এটি হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতে তার প্রথম সফর। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল বিজয় পাওয়ার পর তিনি সরকার গঠন করেন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যান। ওই আন্দোলনে শত শত মানুষ নিহত হন। এরপর থেকে তিনি ভারতেই অবস্থান করছেন।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে ঘিরে সেই সম্পর্ক নতুন করে স্বাভাবিক করার সুযোগ দেখছে দিল্লি। তবে এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে আছে ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান।

বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তবে শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এএম সালেহ বলেন, ‘আমরা একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছি এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দ্রুত করার বিষয়ে ভারতীয় পক্ষের জবাবের অপেক্ষায় আছি।’

ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধটি তারা বিবেচনা করছে।

হাসিনাকে ঘিরে অস্বস্তি
শেখ হাসিনার বিষয়টি সামনে থাকলেও নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে দিল্লি একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই তাকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে ‘সর্বোচ্চ সম্মান’ দেওয়া হবে এবং ‘স্মরণীয় স্বাগত’ জানানো হবে বলে জানিয়েছেন ত্রিবেদী।

প্রতিবেশী কোনো দেশের নেতাকে স্বাগত জানাতে ভারতের পক্ষ থেকে এমন প্রকাশ্য আগ্রহকে কিছুটা ব্যতিক্রমী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, ‘আমার ধারণা, দিল্লিতে কিছুটা হতাশা রয়েছে। কারণ হাসিনাকে হস্তান্তর করা ছাড়া তারা ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে বেশ অনেক দূর এগিয়েছে।’

তার মতে, বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং চিকিৎসা ভিসা দেওয়াসহ বিভিন্ন তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে ভারত উদ্যোগ নিয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য সহজ করার জন্য কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাও পুনরায় চালু করা হয়েছে।

কেন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভারতের
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতিরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, যার বড় অংশই ভারতের অনুকূলে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক।

শেখ হাসিনা টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় দুই দেশ সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ বাড়িয়েছে। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ সহজ হয়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দুই দেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। বাংলাদেশে সক্রিয় ছিল বলে ভারত যেসব বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অভিযোগ করেছিল, হাসিনা সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল। তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে ক্রমেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগকে উপেক্ষা করে দিল্লি হাসিনা সরকারের প্রতি সমর্থন দিয়ে গেছে। ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান সেই অস্বস্তি আরও জিইয়ে রেখেছে।

গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার বিদেশি সংবাদদাতাদের সংগঠনের একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। তিনি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে নিজের সমর্থকদের দমন করার অভিযোগ তোলেন।

এ ঘটনায় বাংলাদেশ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে বলা কোনো বক্তব্যকেই তারা সমর্থন করে না— বিশেষ করে বাংলাদেশের সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিষয়ে দেওয়া বক্তব্যকে নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, শেখ হাসিনা ওই বক্তব্য দেওয়ার আগে তারেক রহমান ভারত সফরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন— এমন খবর ছিল।

তার ভাষায়, ‘এটি আসলে বাংলাদেশে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তুলতে সত্যিই আন্তরিক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’

ফলে শেখ হাসিনা ভারতে থাকা অবস্থায় তারেক রহমানের দিল্লি সফর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাজনৈতিক মূল্যও তৈরি করতে পারে।

পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও ভাবাচ্ছে দিল্লিকে
তবে ভারতের উদ্বেগের কারণ শুধু শেখ হাসিনা নন। তার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশ ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে। ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর হয়েছে। দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও প্রকাশ্যে কথা বলেছে। এসব পরিবর্তনের দিকে গভীর নজর রাখছে দিল্লি।

২০০০-এর দশকে ভারত অভিযোগ করেছিল, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ ও সীমান্ত পারাপারে সহায়তা করেছে। সে সময় পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়েই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। এর পাশাপাশি চলতি মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তিও বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। শক্তিশালী তিন মুসলিম দেশের এই প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে।

চুক্তিটির বিস্তারিত এবং এতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নির্দিষ্ট দায়িত্ব এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এটি ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি— অর্থাৎ কোনো একটি সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

বাংলাদেশের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে আমাদের তাতে অংশ নেওয়ার কথা বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।’

সৌদি আরবও তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশকে মক্কা চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, এ ধরনের কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের সতর্ক হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ‘প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছুটা সতর্ক হওয়া উচিত। বিষয়টি শুধু ভারতকে বিরোধিতা করার নয়; বাংলাদেশকে কিছু সময় অপেক্ষা করে দেখতে হবে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং সেটি আমাদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।’

ভারতের জন্য এসব ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার সময় যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, দিল্লি এখন আর সেটিকে স্বাভাবিক ধরে নিতে পারছে না। অন্যদিকে তারেক রহমানের সরকারেরও প্রয়োজন রয়েছে দেখানোর যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তার বড় প্রতিবেশী ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয়।

অধ্যাপক ইয়াসমিন মনে করেন, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকের আগে তারেক রহমানের দিল্লি সফর করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবেশীদের একসঙ্গে বসবাস করতেই হয়।’


সময়ের আলো/কেএইচ



  বিষয়:   সময়ের আলো  ভারত  বাংলাদেশ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: