২০ লাখ ইরানি রিয়ালেও হচ্ছে না বাজার

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের অর্থনীতি। দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এসব নিষেধাজ্ঞা

2026-08-28T03:25:54+00:00
2026-08-28T03:27:08+00:00
 
  শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রকট
২০ লাখ ইরানি রিয়ালেও হচ্ছে না বাজার
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৩:২৫ এএম  আপডেট: ২৮.০৮.২০২৬ ৩:২৭ এএম
ইরানের বাজার। ছবি : সংগৃহীত
কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের অর্থনীতি। দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে ইরানি রিয়ালের ব্যাপক পতন ঘটেছে এবং মূল্যস্ফীতির সংকট সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশ ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে।

বর্তমানে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানের রিয়ালের দর নতুন সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। খোলাবাজারে এক ডলারের বিনিময়মূল্য ২০ লাখ রিয়াল ছাড়িয়েছে। ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলে দুর্বল করে দেওয়ার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ইরানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কতটা বেড়েছে, তা বোঝাতে আলজাজিরা তেহরানের বাজারে খাদ্য, পোশাক ও ওষুধের দাম সংগ্রহ করেছে এবং যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের একই পণ্যের দামের সঙ্গে তুলনা করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ২০ লাখ রিয়াল দিয়ে প্রায় ৪ কেজি টমেটো, আধা কেজি মুরগির মাংস এবং ১ লিটারের সামান্য কম রান্নার তেল কেনা যেত। এখন একই পরিমাণ অর্থে এর প্রায় অর্ধেক পণ্য কেনা যায়। টমেটোর গড় দাম বেড়েছে ৭১ শতাংশ, মুরগির দাম বেড়েছে ৭৪ শতাংশ এবং রান্নার তেলের দাম বেড়েছে ১৭৭ শতাংশ।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য ইনসুলিনের দাম বেড়েছে ৬৪২ শতাংশ। প্যারাসিটামলের মতো প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। আর সরকার বড় ধরনের ভর্তুকি দিলেও শিশুখাদ্যের দাম বেড়েছে ৯৫ শতাংশ। যুদ্ধের আগে এবং গত বুধবারের খাদ্য, পোশাক ও ওষুধের গড় দাম তুলনা করে দেখা গেছে এসব পণ্যের দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে। অনেক ইরানি বলছেন, আমাদের একমাত্র চিন্তা, এই আয় দিয়ে মাসটা কীভাবে শেষ করব।


ইরানের পরিবারগুলোর জন্য এই পরিস্থিতির অর্থ শুধু কম পরিমাণে কেনাকাটা করা নয়; তারা কী খাবেন, তাতেও পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। ৩৫ বছর বয়সি আফসানেহ তেহরানে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করেন। তাদের এক বছর বয়সি একটি সন্তান রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, তাদের পরিবারের সাপ্তাহিক বাজার খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

আফসানেহ আলজাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের আগে আমরা তিন বা ছয় মাস পর কী করতে চাই তা নিয়ে ভাবতে পারতাম। কিন্তু এখন আমাদের একমাত্র চিন্তা হলো, যে আয় আছে তা দিয়ে কীভাবে মাসটা শেষ করব। তিনি আরও বলেন, আমি ও আমার স্বামী দুজনই কাজ করি এবং আমাদের এক বছর বয়সি একটি সন্তান রয়েছে। এখন শিশু যত্নকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিনের খরচ প্রায় পাঁচ লাখ তোমানে (৫০ লাখ রিয়াল বা দুই দশমিক পাঁচ ডলার) পৌঁছেছে, যা আমাদের জন্য বহন করা কঠিন।

তোমান হলো ইরানে রিয়ালের অনানুষ্ঠানিক একটি হিসাবের একক। এক তোমান সমান ১০ ইরানি রিয়াল। দেশটিতে বিপুল অঙ্কের মুদ্রামূল্য হিসাব করা সহজ করার জন্য মানুষ ব্যাপকভাবে তোমান ব্যবহার করে।

সরকারের দেওয়া শিশুখাদ্যের ভর্তুকি আফসানেহর মতো পরিবারগুলোকে কিছুটা সহায়তা করছে। তবে তাদের শিশুর মাসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টিবিষয়ক পরিপূরক সামগ্রীর খরচ বীমার আওতায় পড়ে না। ফলে শিশুর জন্য মানসম্মত চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আফসানেহর পরিবারের মতো ছোট পরিবারগুলোর জন্য এখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে টিকে থাকা এবং খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো। তিনি বলেন, নতুন পোশাক কেনা কিংবা গাড়ি পরিবর্তনের মতো অনেক পরিকল্পনা আমরা বাদ দিয়েছি। আর আমার মনে হয় না, শিগগির পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

দাম বেড়ে গেছে সবকিছুরই। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি উৎপাদন ব্যাহত করেছে। একই সময়ে ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পণ্য আমদানি ও রফতানিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রিয়ালের দরপতনের কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়েছে। একই সময়ে মানুষের মজুরি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি।


মার্চ ২০২৭-এ শেষ হতে যাওয়া চলতি ইরানি পঞ্জিকা বছরের জন্য সরকার অনুমোদিত ন্যূনতম মজুরি ১৬ কোটি ৬০ লাখ রিয়াল (৮২ ডলার)। সরকারি সহায়তা ও অন্যান্য সুবিধা যুক্ত করার পরও এই অঙ্ক ২২ কোটি রিয়ালের (১০৮ ডলার) কম। তেহরানের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সি জামিরের পুরুষদের পোশাকের দোকান আছে। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, গত বছরের তুলনায় তার বিক্রি ৪০ শতাংশ কমেছে এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।

তিনি বলেন, আমি বলতে পারি যে এই বাজারে কাজ করা অনেক মানুষ শীত শেষ হওয়ার আগেই দেউলিয়া হয়ে যাবেন এবং ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। জামির বলেন, সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। শ্রমিকদের মজুরি, কাঁচামালের দাম এবং আপনি আর যা কিছু ভাবতে পারেন, প্রায় সবকিছুরই দাম বেড়েছে। তিনি জানান, অনেক খুচরা বিক্রেতা তাদের গ্রীষ্মকালীন পণ্য ক্রয়মূল্যের চেয়েও কম দামে বিক্রি করছেন। শরৎকালে নতুন করে যে মূল্যবৃদ্ধি হবে, তা তখন খুচরা দোকানগুলোতে পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে।
জামির বলেন, বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আবার বাড়ি ফিরে আসা পর্যন্ত কফি, সিগারেট, পানি ও যাতায়াতের মতো বিষয়েই অন্তত ২০ লাখ তোমান (১০ ডলার) খরচ হয়ে যায়। আপনি যদি খরচের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কও থাকেন, তারপরও প্রতিদিন অন্তত সাত লাখ থেকে আট লাখ তোমান (তিন দশমিক পাঁচ থেকে চার ডলার) খরচ করতেই হবে। আর এর মধ্যে নিয়মিত বাজার ও পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের খরচ ধরা নেই।

যারা বেতনের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য মূল্যস্ফীতি আরও একটি সমস্যা তৈরি করছে। কারণ আজ যে বেতন পাওয়া যাচ্ছে, পরবর্তী বেতন পাওয়ার আগেই তার প্রকৃত মূল্য কমে যেতে পারে। ২৮ বছর বয়সি সালামা এক সন্তানের মা। তিনি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় প্রদেশ হরমোজগানে জেলে হিসেবে কাজ করেন। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী এই এলাকায় তিনি কাজ করেন। 

তার জন্য বাজারের পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব অনেক বেশি। সালামা বলেন, আগে আমরা প্রায় পাঁচ লাখ তোমানে (দুই দশমিক পাঁচ ডলার) সাপ্তাহিক বাজার করতে পারতাম। এখন একই বাজারের জন্য অন্তত ৫০ লাখ তোমান (২৫ ডলার) খরচ করতে হচ্ছে। মাংস ও মুরগির মতো পণ্য আমাদের কমাতে হয়েছে, এমনকি অনেক সময় পুরোপুরি বাদও দিতে হয়েছে। সালামা জানান, তার আয় বাড়ার পরিবর্তে বরং কমেছে। ফলে তাকে খরচ কঠোরভাবে কমিয়ে আনতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, শিশুদের সাধারণ সর্দির ওষুধ কিংবা মৌসুমি অ্যালার্জির ওষুধ এমনকি ইরানে তৈরি ওষুধের জন্যও এখন প্রায় তিন লাখ তোমান (এক দশমিক পাঁচ ডলার) খরচ হয়। আর সাধারণ চিকিৎসকের কাছে একবার যাওয়ার খরচও ১০ লাখ তোমানের (পাঁচ ডলার) কম নয়। যুদ্ধ ইরানের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো তৈরি করেনি, তবে সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং অবরোধ নতুন চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে বেকারত্ব ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্থবির হয়ে পড়ায় পরিবারগুলোর এসব বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে। কয়েক কোটি ইরানির জন্য এখন প্রশ্নটি আর পণ্যের দাম কতটা বেড়েছে তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো এক মাসের বেতন দিয়ে এক মাসের খাবার, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর কতটা এখন কেনা সম্ভব সে বিষয়টিই।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা


  বিষয়:   ডলার  রিয়াল  ইরান  বাজার  অর্থনীতি  ক্ষতিগ্রস্ত  যুক্তরাষ্ট্র  মূল্যস্ফীতি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: