ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা, তেহরানে কাতার-ওমান-পাকিস্তান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই তেহরান সফর করছেন কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। একের পর এক উচ্চপর্যায়ের

2026-08-27T19:13:11+00:00
2026-08-27T19:13:11+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬,
১২ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা, তেহরানে কাতার-ওমান-পাকিস্তান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৭:১৩ পিএম 
২৫ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে ইরানের তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি (ডানে) ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদির সাথে সাক্ষাৎ করছেন। সংগৃহীত ছবি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই তেহরান সফর করছেন কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। একের পর এক উচ্চপর্যায়ের এই সফরকে কেন্দ্র করে মধ্যস্থতার নতুন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সামরিক উত্তেজনা না বাড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে দুই পক্ষেরই কিছুটা আগ্রহ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তেহরানে পৌঁছেছেন। উত্তেজনা কমানো এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ আলোচনা আবার শুরু করার লক্ষ্যেই তার এই সফর বলে জানিয়েছেন কাতারের এক মুখপাত্র।

তেহরানে কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে সংঘাত বন্ধের উপায় এবং সংলাপের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীকে যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো ভিন্ন। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশের বেশি এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হতো। সংঘাতের পর নৌপথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

কাতার এর আগেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গত জুনে সংঘাত সাময়িকভাবে থামাতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ক্ষেত্রেও দেশটির ভূমিকা ছিল। তবে সেই সমঝোতার মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

তেহরানে একের পর এক বিদেশি প্রতিনিধি 

কাতারের আমিরের সফরের আগে সোমবার তেহরানে যান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। সেখানে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন মহাসচিব মোহসেন রেজাইয়ের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন তিনি।

এর পরদিন তেহরানে যান ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠকে হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। কয়েক সপ্তাহ ধরেই এই অভিন্ন জলপথের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের দিনই ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি জানান, হরমুজ প্রণালীতে একটি নতুন অস্থায়ী নৌপথ নিয়ে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছেছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় জাহাজগুলো ইরানের জলসীমা দিয়ে প্রবেশ করবে এবং বহির্গমন পথের ওপর তেহরান আংশিক নিয়ন্ত্রণ রাখবে।

তবে ইরানের অবস্থানও স্পষ্ট— যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ সম্পদ অবমুক্ত না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না।

সামরিক চাপ থেকে অর্থনৈতিক চাপে ইরান  

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো সংঘাতে রয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরকে পরাজিত করার দাবি করলেও দীর্ঘ সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য উভয়কেই দিতে হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগের খবরের মধ্যেই ওয়াশিংটন সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। চলতি সপ্তাহে ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া অন্যান্য দেশ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।


সোমবার ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতকে লক্ষ্য করে ৬০টির বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান চলাচল ও জাহাজ চলাচল খাত এর আওতায় রয়েছে। ইরানের তেল ও আর্থিক খাত অবশ্য আগেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ছিল।

নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়বে চীন, হংকং, যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন, সিরিয়া, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর।

ইরান এসব নিষেধাজ্ঞার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। জাতিসংঘে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে ‘রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং সদস্য দেশগুলোকে তা বাস্তবায়ন না করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আলোচনায় কতটা আগ্রহী ইরান?  

কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য বক্তব্যে এখনো সমঝোতার স্পষ্ট বার্তা নেই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার আলজাজিরাকে বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করার বিষয়ে তার কোনো তাড়া নেই। তার দাবি, তেহরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ কার্যকর হচ্ছে।

অন্যদিকে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারাও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছেন। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মহাসচিব মোহসেন রেজাইও বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না।

তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্ন সুর পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে তিনি শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনায় যাওয়ার পক্ষে মত দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইরান যেহেতু শক্তি ও মর্যাদার অবস্থানে রয়েছে, তাই এখন যুদ্ধ শেষ করাই ভালো।

তবে ইরানের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অধীনে প্রেসিডেন্টকে কাজ করতে হয়। সামরিক বাহিনীর কট্টরপন্থী অংশ এরই মধ্যে জুনের সমঝোতায় যাওয়ার জন্য সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকারের অভিযোগ করেছে। পেজেশকিয়ান অবশ্য সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ওই সমঝোতা আত্মসমর্পণ ছিল না।
 
কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে কী?

তেহরানে সাম্প্রতিক বিদেশি প্রতিনিধিদের সফরে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত— এমন নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপও একটি কৌশল হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক আলী ভায়েজের মতে, নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সামরিক অবরোধের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর প্রশ্ন—এই চাপ কি ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল করার জন্য নেওয়া ‘শূন্য-ফলাফল’ কৌশল, নাকি শেষ পর্যন্ত একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরানকে বাধ্য করার জন্য চাপ প্রয়োগের কৌশল?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের ধারাবাহিক তেহরান সফর এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনার অগ্রগতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

সূত্র : আল-জাজিরা 

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   ইরান  কূটনৈতিক  তৎপরতা  তেহরান  কাতার  ওমান  পাকিস্তান 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: