নেপাল ট্র্যাজেডির পেছনে যে ৫ কারণ

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা আবারও সামনে এনেছে হিমালয় অঞ্চলের বাড়তে থাকা

2026-08-27T18:51:51+00:00
2026-08-27T18:51:51+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬,
১২ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
নেপাল ট্র্যাজেডির পেছনে যে ৫ কারণ
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৫১ পিএম 
নেপালে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢল।
নেপালে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা আবারও সামনে এনেছে হিমালয় অঞ্চলের বাড়তে থাকা দুর্যোগঝুঁকি। পাহাড়ের বরফ ও পাথর ধস, হিমবাহের হ্রদ ভেঙে যাওয়া, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন— বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ মিলেই সেখানে কয়েক মিনিটের মধ্যে ভয়াবহ বন্যা তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণ অনেক সময় একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তোলে। বিশেষ করে হিমবাহের বরফ ও পাথরের ধস নদীর গতিপথ আটকে দিলে সাময়িক জলাধার তৈরি হতে পারে। পরে সেই বাঁধ ভেঙে বিপুল পানি, কাদা ও পাথর একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে আসে।

নেপালে আকস্মিক বন্যার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি কারণ হলো—

১. হিমবাহ ও পাথর ধস  

হিমালয়ের উচ্চভূমিতে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ হঠাৎ ভেঙে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসতে পারে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমে থাকা বরফ-মাটি গলে গেলে পাহাড়ের ঢাল ও পাথরের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে বরফ ও শিলার বড় অংশ ধসে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।

এ ধরনের ধস পাহাড়ি নদীতে গিয়ে পড়লে নদীর পানি, বরফ, পাথর ও কাদা মিশে অত্যন্ত শক্তিশালী ধ্বংসপ্রবাহ তৈরি করতে পারে। এই স্রোত খুব অল্প সময়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নদীর তীরবর্তী জনবসতিতে আঘাত হানতে পারে।

২. হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা 

হিমালয়ে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহ গলে অনেক জায়গায় নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে। আবার আগে থেকে থাকা হিমবাহের হ্রদেও পানির পরিমাণ বাড়ছে। এসব হ্রদের অনেকগুলোই বরফ, পাথর ও হিমবাহের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে অবস্থান করে।

কোনো কারণে সেই বাঁধ দুর্বল হয়ে গেলে বা অতিরিক্ত পানির চাপে ভেঙে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে বিপুল পানি নিচের দিকে নেমে আসে। এ ধরনের ঘটনাকে হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা বা জিএলওএফ বলা হয়।

হিমবাহের হ্রদ ভেঙে নামা পানির সঙ্গে পথে কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ যুক্ত হলে এর ধ্বংসক্ষমতা আরও বেড়ে যায়।

৩. মেঘভাঙা বৃষ্টিপাত 

নেপালের পাহাড়ি এলাকায় অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতও আকস্মিক বন্যার অন্যতম কারণ। বর্ষা মৌসুমে স্থানীয় আবহাওয়াগত পরিস্থিতির কারণে কোনো কোনো এলাকায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল বৃষ্টি হতে পারে।

পাহাড়ি ঢাল খাড়া হওয়ায় বৃষ্টির পানি মাটিতে ধীরে ধীরে শোষিত হওয়ার সুযোগ কম পায়। ফলে পানি দ্রুত পাহাড় বেয়ে নেমে নদী ও ছড়ায় জমা হয়। নদীর ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে অতিবৃষ্টির সঙ্গে ভূমিধস যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পাহাড় ধসে নদীর পথ আটকে যাওয়ার পর সেই বাধা ভেঙে গেলে একসঙ্গে বিপুল পানি নেমে আসতে পারে।

৪. ভূমিধসজনিত কৃত্রিম বাঁধ বিস্ফোরণ  

পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়াও বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। ভারী বৃষ্টি বা পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়লে মাটি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নদীতে পড়ে এর প্রবাহ আটকে দিতে পারে।


এভাবে নদীর ওপর একটি অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়। এর পেছনে ধীরে ধীরে পানি জমতে থাকে। একপর্যায়ে পানির চাপ ওই বাঁধের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে তা হঠাৎ ভেঙে যেতে পারে।

তখন আটকে থাকা বিপুল পানি পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সঙ্গে নিয়ে প্রবল বেগে নিচের দিকে ছুটে যায়। নদীর তীরবর্তী গ্রাম, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য স্থাপনা এতে মুহূর্তেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৫. জলবায়ু পরিবর্তন  

হিমালয়ের দুর্যোগঝুঁকি বাড়ার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন হচ্ছে। এর ফলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া, নতুন হিমবাহ-হ্রদ তৈরি এবং চরম আবহাওয়ার প্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপ। পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ, অপরিকল্পিত বসতি, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন পাহাড়ের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এতে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে এবং বন্যার পানি স্বাভাবিকভাবে নেমে যাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ফলে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হলে তার ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হতে পারে।

এক বিপর্যয় থেকে আরেক বিপর্যয় 

নেপালের পাহাড়ে আকস্মিক বন্যার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো— একটি ঘটনা খুব দ্রুত আরেকটি দুর্যোগের জন্ম দিতে পারে। বরফ বা পাথরের ধস নদীতে পড়তে পারে, নদীর প্রবাহ আটকে হ্রদ তৈরি হতে পারে, পরে সেই বাধা ভেঙে বন্যা নেমে আসতে পারে। সেই বন্যার সঙ্গে আবার কাদা ও পাথর মিশে ধ্বংসপ্রবাহ তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ পাহাড়ের কয়েক হাজার মিটার ওপরে শুরু হওয়া একটি ঘটনা কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যে বহু দূরের জনপদে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এই কারণেই নেপালের মতো পাহাড়ি দেশে শুধু বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস নয়, হিমবাহ, হিমবাহের হ্রদ, পাহাড়ের ঢাল ও নদীর গতিপথ—সবকিছুর ওপর সমন্বিত নজরদারি জরুরি। আগাম সতর্কতা, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে এমন দুর্যোগে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

সূত্র : আইপিসিসি ও নেপাল জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ 

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   নেপাল ট্র্যাজেডির বন্যা  পাহাড়ি ঢল 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: