নেপালের রাসুয়া জেলায় বুধবার ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ ভয়াবহ বন্যার পর এর কারণ খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। প্রাথমিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দেয়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে এই বন্যার সৃষ্টি করে। এরই মধ্যে দুর্যোগস্থলের উজানে নতুন একটি হ্রদ তৈরি হওয়ায় আরও বন্যার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাধি এলাকায় ভোতে কোশি নদীর পানি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ নিরাপদ স্থানে ছুটে যায়। পরে বন্যার পানি রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিংয়ের বিভিন্ন জনপদে ছড়িয়ে পড়ে। ভেসে যায় সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো।
পরবর্তী সময়ে রাসুয়াসহ নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান, তানাহুন, গোরখা ও নওয়ালপরাসি ইস্ট জেলা থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে ৩৫৯ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন হাজারের বেশি মানুষ।
নুয়াকোটের সহকারী প্রধান জেলা কর্মকর্তা কৃষ্ণ প্রসাদ হুমাগাইন কান্টিপুরকে বলেছেন, তার দেখা স্মৃতির মধ্যে ওই এলাকায় এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা।
বন্যার কারণ কী ধস, নাকি ভূমিকম্প?
বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে বলছেন, বরফ ও পাথরের বিশাল একটি ধস নদীর প্রবাহ আটকে সাময়িক প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করে থাকতে পারে। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে জমে থাকা পানি ও ধ্বংসাবশেষ প্রবল স্রোতে নিচের দিকে নেমে আসে।
তবে এ ঘটনার সঙ্গে একই সময়ে ঘটে যাওয়া একটি ভূমিকম্পের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বতে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল গোসাইকুণ্ডার প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে। এটি ধসের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি।
নেপালি টাইমস-এ সাংবাদিক কুন্দা দীক্ষিত জানিয়েছেন, ৭ হাজার ২৪৫ মিটার উঁচু লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢালে একটি তুষারধস বা বরফধসের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। ওই পর্বতের দক্ষিণ ঢালেও ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময় ধস নেমেছিল। তখন লাংটাং গ্রাম বরফ ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়ে প্রায় ৩০০ মানুষ মারা যান।
দীক্ষিতের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাংটাং লিরুং পুরোপুরি নেপালের ভেতরে অবস্থিত। সেখান থেকে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষ নেপাল-চীন সীমান্তের লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। বর্ষার পানিতে নদীতে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হওয়ার পর সেই বাধা ভেঙে কাদা ও বড় বড় পাথরের স্রোত ভোতে কোশি নদীর দিকে নেমে আসে।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষক ও অধ্যাপক রিজান ভক্ত কায়াস্থও মনে করছেন, একটি ধস লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়ার পর বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, নেপালের অংশে একটি ধস লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দিয়েছিল বলে তাঁরা ধারণা করছেন। একই সময়ে একটি ভূমিকম্প হয়েছিল, তবে সেটি ধসের সূত্রপাত ঘটাতে ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা এখনো জানা যায়নি।
এমন বন্যার ঝুঁকি আগে থেকেই ছিল
এই অঞ্চল আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আগে থেকেই পরিচিত। গত বছরের ৮ জুলাইও ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ পানির প্রবল স্রোত দেখা দিয়েছিল। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ পরে জানায়, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লেন্দে নদীতে হিমবাহ-হ্রদের পানি উপচে পড়ার কারণেই ওই বন্যা হয়েছিল।
স্যাটেলাইটের সেন্টিনেল ছবির বিশ্লেষণেও একটি হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে পানি নিচের দিকে নেমে আসার প্রমাণ পাওয়া যায়।
হিমালয়জুড়ে এ ধরনের বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদের উপস্থিতি নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন। আন্তর্জাতিক সমন্বিত পার্বত্য উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির এক গবেষণায় নেপাল, ভারত ও তিব্বতে ৩ হাজার ৬২৪টি হিমবাহ-হ্রদের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক এবং হঠাৎ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসবের মধ্যে ২১টি নেপালে।
তবে বুধবারের মতো বরফ ও পাথরের ধস ঠিক ওই এলাকায় ঘটবে—এমন কোনো নির্দিষ্ট পূর্বাভাস ছিল না।
কী বলছে স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ?
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও বরফ ও পাথরের ধসকেই বন্যার সম্ভাব্য প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করছে।
প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে রাসুওয়াগাধি সীমান্তচৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি একটি বড় ধসের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেই ধসের ধ্বংসাবশেষ লেন্দে নদীতে গিয়ে পড়ে এবং পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত তৈরি করে।
আইসিআইএমওডির বিজ্ঞানীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, নদীর সংকীর্ণ কোনো অংশে ধ্বংসাবশেষ জমে সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ আটকে দিয়েছিল কি না। এ ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধকে বলা হয় ‘ল্যান্ডস্লাইড ড্যাম’।
প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক মূল্যায়নে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ভিডিও ও বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোতে কোশির উপনদী লেন্দে নদীতে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে পারে।
এর ফলে যে বন্যা সৃষ্টি হয়, তার গতি ছিল অস্বাভাবিক। আইসিআইএমওডির তথ্য অনুযায়ী, গালছিতে মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলী নদীর পানি প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। একই সময়ে মালেখুতে নদীর পানি প্রায় ৭ মিটার বৃদ্ধি পায়।
আইসিআইএমওডির রিমোট সেন্সিং ও ভূ-তথ্যবিষয়ক সহযোগী সারথক শ্রেষ্ঠ বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য নেপালের অংশে একটি ধসকেই বন্যার প্রধান কারণ হিসেবে নির্দেশ করছে।
তাঁর ভাষ্য, স্যাফ্রুবেশির ওপরে একটি ধস নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়ার পরই বন্যা নেমে আসে বলে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে। পুরো ঘটনাটি নিশ্চিতভাবে বুঝতে আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
চীনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া স্যাটেলাইট ছবির প্রাথমিক পর্যালোচনাতেও ধসটি নেপালের অংশে ঘটেছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আইসিআইএমওডি জানিয়েছে, চীনের তিব্বত অংশে এ মাত্রার বন্যা ঘটাতে পারে—এমন কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা তাদের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় ধরা পড়েনি।
আবারও বন্যার আশঙ্কা আছে?
বিজ্ঞানীরা এখনো নতুন করে বন্যার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। বুধবার বিকেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং জানিয়েছিলেন, লেন্দে নদীর পথ তখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি।
অধ্যাপক রিজান ভক্ত কায়াস্থ বলেন, উজানে বিপুল পরিমাণ পানি জমে নতুন কোনো জলাধার তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে শুরুতে উদ্বেগ ছিল। তবে এমন কোনো হ্রদ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
এর ওপর ওই এলাকায় মেঘের আচ্ছাদন থাকায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে আইসিআইএমওডি।
কায়াস্থ বলেন, ঝুঁকি এখনো রয়েছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে হিমবাহ গলে যাওয়া, বরফ ও পাথরের ভেঙে পড়া এবং হিমালয়ে ধসের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তবে পরবর্তী ঘটনা ঠিক কোথায় ঘটবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
চীনে নতুন হ্রদ ঘিরে উদ্বেগ
এরই মধ্যে দুর্যোগস্থলের নিচের দিকে চীন আরেকটি সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে।
চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে চোচেন নদী ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে একটি বড় হ্রদ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সেখানে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমে এবং হ্রদ থেকে পানি বের হতে শুরু করেছে বলে চীনের গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে।
চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি ওই হ্রদে প্রবেশ করতে পারে। এতে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ হ্রদটির পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে। সম্ভাব্য বাঁধ ভেঙে গেলে কী ধরনের বন্যা হতে পারে, তা বুঝতে পানির প্রবাহের বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে মডেলিংও করা হচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি সহায়তা ও উদ্ধার তৎপরতার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
চোচেন ও পুরেপু নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। নেপালে প্রবেশের আগে নদী দুটি একত্রিত হয়েছে। নেপালে এই নদীই ভোতে কোশি নামে পরিচিত। ভোতে কোশি ত্রিশূলী নদীর প্রধান উজানের উপনদী।
ফলে বুধবারের ভয়াবহ বন্যার পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বিজ্ঞানীরা একদিকে বন্যার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে কাজ করছেন, অন্যদিকে উজানে তৈরি হওয়া নতুন জলাধার ও হিমবাহ-সংলগ্ন এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণে রাখছেন।
সময়ের আলো/জেডি