নেপালের ভয়াবহ বন্যায় মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে রাসুয়া জেলার বেত্রাবতী ও সোল বাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা। শৈশবের সেই গ্রাম, যেখানে খেলেছেন, মাঠে কাজ করেছেন, স্কুলে যাওয়ার পথে হেঁটেছেন— প্রবল স্রোতে সেই পরিচিত জনপদ এখন ধ্বংসস্তূপ। আর দূরে বসে একের পর এক ফোনকল ও ভিডিওতে নিজের গ্রামের এই পরিণতি দেখেছেন ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর সাংবাদিক অর্জুন।
বুধবার (২৭ আগস্ট) সকালে কাঠমান্ডুর কান্টিপুর পাবলিকেশন্সের কার্যালয়ে যাওয়ার পথে স্ত্রী ফোন করে তাকে বন্যার খবর দেন। তার স্ত্রী জানান, ‘ত্রিশুলীতে বন্যা হয়েছে। সোল বাজার আর বেত্রাবতীতে বড় কিছু ঘটেছে। লোকজন বলছে, সেখানে আর কিছুই নেই।’
প্রথমে কথাটি বিশ্বাস করতে পারেননি অর্জুন। সোল তার নিজের গ্রাম। সেখানকার গলিতে তার শৈশব কেটেছে, মাঠে কাজ করেছেন, বছরের পর বছর সেই পথ ধরে স্কুলে গেছেন। এমনকি বর্ষার সময়ও নদীর পানি কখনো গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
তাই স্ত্রীর কথা শুনে তিনি খবরটিকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে অফিসের দিকে রওনা হন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর একটি সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম তার সব সন্দেহ দূর করে দেয়।
সঙ্গে সঙ্গে সোল বাজারে থাকা সাংবাদিক বন্ধু নিরঞ্জনকে ফোন করেন তিনি। নিরঞ্জনের পরিবারও সেখানে থাকে। বন্ধু নিরঞ্জন তাকে জানান ‘আমি মাত্র শুনলাম, দাই। কাউকেই ফোনে পাচ্ছি না। মা-বাবা, চাচা, চাচি—কারও ফোনই বাজছে না।’
এরপর শুরু হয় একের পর এক ফোনকল। অর্জুন ও নিরঞ্জন নিজেদের জানা সব নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু কোনো ফোনই সংযোগ পাচ্ছিল না।
শেষ পর্যন্ত একজন আত্মীয়ের বাড়িতে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। ফোন ধরেই ওই নারী বলেন, ‘গ্রামে আর কিছুই নেই। বেশিরভাগ মানুষ চলে গেছে।’
অর্জুন তখনও কথাটি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সোল ও টুপছে নদীর তলদেশ থেকে প্রায় ১০০ মিটার উঁচুতে। তার ৪৪ বছরের জীবনে কখনো নদীর পানি ওই এলাকায় পৌঁছাতে দেখেননি তিনি।
সেই গ্রামে তার আত্মীয়, প্রতিবেশী, শৈশবের বন্ধু— প্রিয়জন বলতে যাদের বোঝেন, তাদের প্রায় সবাই থাকেন সেখানে।
এরপর একে একে তাদের ফোন করতে শুরু করেন অর্জুন। কিছুক্ষণ পর তার মুঠোফোনে আসতে থাকে ছবি ও ভিডিও। সেসব দৃশ্যের জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।
তার বড় খালা পানিতে ভেসে গেছেন। একই পরিণতি হয়েছে তার ছেলে মধু, যাকে অর্জুন ‘দাই’ বলে ডাকতেন, এবং মধুর স্ত্রীর। আরেক খালাও নিখোঁজ। তার নাতি সিজান ও সিজানের স্ত্রীও পানির স্রোতে ভেসে গেছেন।
অর্জুনের মামা বুধবার সকালে গবাদিপশুর জন্য ঘাস কাটতে বেরিয়েছিলেন। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি।
স্থানীয় ওয়ার্ড চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপালের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। তিনি অর্জুনকে বলেন, ‘ভাই, আমি সকালে পৌরসভা কার্যালয়ে এসেছিলাম। এখন এখানেই আটকে আছি। গ্রামে আর কিছুই নেই। বাকিটা আপনি নিজেই বুঝতে পারছেন।’
কেউ কেউ পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে উঠে প্রাণে বেঁচেছেন। স্থানীয় এক শিক্ষকও জানান, তিনি নিজের পরিবারের সদস্যদেরই খুঁজে পাচ্ছেন না।
ওই শিক্ষক বলেন, বেত্রাবতীর প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িঘর ভেসে গেছে। একটি স্কুলভ্যানও পানিতে চলে গেছে। তার কাছে থাকা এক শিশুর পা ভেঙে গেছে। পাশে থাকা আরেক ব্যক্তির পা ভেঙেছে, চোখেও গুরুতর আঘাত লেগেছে। দ্রুত হেলিকপ্টার পাঠিয়ে তাঁদের উদ্ধারের অনুরোধ জানান তিনি।
এরপর আসে আরও ভয়াবহ খবর। নিরঞ্জনের চাচা ফোন করে জানান, নিরঞ্জনের বাবা-মা, চাচা, চাচি এবং ছোট বোন হিমানি— সবাই পানিতে ভেসে গেছেন। ফোনে তিনি বলেন, ‘আমরা শেষ, অর্জুন। আমি এখন ফোন রাখছি।’ এরপর ফোনটি কেটে দেন তিনি।
বেত্রাবতী শুধু একটি বাজার নয়। নেপাল ও তিব্বতের যুদ্ধের পর দুই দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তিও হয়েছিল এই এলাকায়। রয়েছে উত্তর গঙ্গাধাম, যেখানে প্রতিবছর পুষ্য অমাবস্যায় মৃত স্বজনদের স্মরণে হাজারো মানুষ আসেন।
বন্যার পর সেই মন্দির, ঐতিহাসিক স্থান ও তীর্থকেন্দ্র— সবই এখন ধ্বংসস্তূপ।সড়ক নেই। বিদ্যুৎ নেই। মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। ইন্টারনেটও বন্ধ।
ত্রিশুলি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের হেডগেটও বন্যায় ভেসে গেছে। পরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্জুনের মনে পড়ে, ২০১০-১১ সালে নেপালে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট চললেও তাঁদের গ্রামে কখনো বিদ্যুৎ থাকেনি— এমন ঘটনা তিনি মনে করতে পারেন না। অথচ এখন পুরো জেলা অন্ধকারে।
বুধবার সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে জেলা সদর অভিমুখে যাওয়ার সময় তিনি নিজেই সেই দৃশ্য দেখেছেন। শুধু তার গ্রাম নয়, পুরো এলাকাই অন্ধকারে ডুবে ছিল।
সকালে জেলা সদরে আসা অনেক গ্রামবাসীও সেখানে আটকে পড়েছেন। তাদের গ্রামে ফেরার কোনো পথ নেই। চিকিৎসার জন্য যারা হাসপাতালে এসেছিলেন, তারাও বাড়ি ফিরতে পারছেন না।
অর্জুনের এক প্রতিবেশী উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের কাছে দাঁড়িয়ে বারবার বলছিলেন, তার চাচা-চাচি পানিতে ভেসে গেছেন। তাঁদের ফোন বন্ধ। নিজের বাড়ির কী হয়েছে, সেটিও তিনি জানেন না।
বন্যা শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নেয়নি, বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে পুরো একটি জেলা। ত্রিশুলি নদীর ওপর ধুঙ্গে ও ত্রিশুলি বাজারকে যুক্ত করা পুরোনো সেতুটি ভেসে গেছে। কয়েক বছর আগে নির্মিত নতুন সেতুটিও নেই। ভাইনসে সেতুসহ নদীর ওপর থাকা প্রায় সব ঝুলন্ত সেতু ধ্বংস হয়েছে।
ফলে জেলা সদরে যাওয়ার কার্যত কোনো পথ নেই। বাগতার জেলা হাসপাতালও এখন দুর্গম হয়ে পড়েছে। ভৈরামকোট, সামারি, টোকসার, দেউরালি, কিসপাং, কাউলে, ভালছে, সালমে এবং সীমান্তের ওপারে ধাদিংয়ের থারপুসহ বহু এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
রাসুয়া জেলা কার্যত দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এক গ্রামবাসীর ভাষায়, ‘এখন কেউ অসুস্থ হলে হয়তো বাড়িতেই মরতে হবে। হাসপাতালে নেব কীভাবে? সড়ক নেই, সেতু নেই, কোনো যানবাহন চলতে পারছে না।’
এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় লবণ কেনার পথও বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়হীন। বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ।
অর্জুন নিজেও প্রায় দেড় দিন ধরে গ্রামের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু জেলা সদর বিদুরে আটকে আছেন। সামনে যাওয়ার কোনো পথ নেই।
দূর থেকে নিজের শৈশবের গ্রামকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখার সেই অভিজ্ঞতা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন— সোল কি আবার কখনো আগের মতো হবে? তিনি জানেন না কতদিন লাগবে। কেউ জানে না।
কারণ কয়েক মিনিটের সেই বন্যায় শুধু ঘরবাড়ি কিংবা সড়ক-সেতু ভেসে যায়নি; হারিয়ে গেছে একটি জনপদের পরিচিত চেহারা, মানুষের নিরাপত্তার অনুভূতি এবং বহু পরিবারের আপনজন।
অর্জুনের ভাষায়, এত সবুজ একটি গ্রামকে কয়েক মিনিটের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে আগে কেউ দেখেনি। গ্রামের প্রবীণরাও বারবার একই প্রশ্ন করছেন—‘এই জায়গাটা কি আর কখনো আগের মতো হবে?’
সময়ের আলো/জেডি