চীন-নেপাল সীমান্তের কাছে সৃষ্ট একটি বিশাল জলাধারের মতো হ্রদ ভেঙে যাওয়ার খবরে নেপালে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হ্রদটি ভেঙে পড়ায় ভোতেকোশি নদীতে ফের পানির ঢল নামতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার রাসুয়া জেলার প্রধান জেলা কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার জানান, চীনের পাশে সৃষ্ট হ্রদটি ভেঙে যাওয়ার তথ্য তাঁকে নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ভোতেকোশি নদী ও আশপাশের এলাকায় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে আকাশপথে নজরদারির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা জানান, ধুনচে ও রাসুয়ার বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই অবস্থান করা হেলিকপ্টারগুলো দিয়ে আকাশপথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ অভিযানের জন্য কাঠমান্ডু থেকে নতুন করে কোনো হেলিকপ্টার পাঠানো হবে না।
এর আগে বৃহস্পতিবার চীনা কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানিয়েছিল, ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে বন্যার পানিতে সৃষ্ট হ্রদটি উপচে পড়ছে। পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকায় হ্রদটি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভোতেকোশি নদীর পানির উচ্চতা বেড়েছে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বৃহস্পতিবার সকালে হ্রদটিতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি ছিল। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, পরবর্তী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে।
সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় চীনা কর্তৃপক্ষ হ্রদটির ওপর নিবিড় নজরদারি চালাচ্ছে। একই সঙ্গে বন্যার পানির গতিপথের মডেল তৈরি ও পানিবিষয়ক বিশ্লেষণ করে হ্রদটি ভেঙে গেলে সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিরূপণের কাজ চলছে।
ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। নেপালে প্রবেশের আগে নদী দুটি একত্রিত হয়েছে। নেপালে এই নদী ভোতেকোশি নামে পরিচিত, যা ত্রিশূলী নদীর প্রধান উজানের উপনদী।
নতুন এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যার মাত্র দুই দিন পর। বুধবার সকালে রাসুয়ার ভোতেকোশি নদীতে হঠাৎ শক্তিশালী ঢল নামে। এতে তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পানির স্রোত ত্রিশূলী নদীর দিকে নেমে যায়।
বন্যার পর থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে নেপালি নিরাপত্তা বাহিনী ও উদ্ধারকারী দলগুলো তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। নদীর নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছে। নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে চলাচল সীমিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
চীনের পাশে সৃষ্ট হ্রদটি ভেঙে যাওয়ার খবর উদ্ধার তৎপরতায় নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। হ্রদ থেকে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি বেরিয়ে এলে ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীপথে ফের পানির ঢল নামতে পারে। এতে নদীর তীরবর্তী বসতি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নতুন করে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এদিকে বুধবারের বন্যার পর হেলিকপ্টারযোগে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের সমন্বয় নিয়ে অভিযোগ ওঠায় ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্রের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
বিমানবন্দরের ওই কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে আইনমন্ত্রী সোচিত গৌতমের নেতৃত্বে হেলিকপ্টার পরিচালনা ও উদ্ধার-ত্রাণ কার্যক্রমের সমন্বয় করা হচ্ছে। দুর্যোগের সময় আকাশপথে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য এই কেন্দ্র সক্রিয় করা হয়।
কেন্দ্রটিতে হেলিকপ্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, নেপাল পুলিশ, নেপালি সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং আবহাওয়া-সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
তবে হ্রদটি ভেঙে যাওয়ার বিষয়ে নেপালি কর্তৃপক্ষ এখনো বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রকাশ করেনি। ভোতেকোশি নদীতে ঠিক কত পরিমাণ পানি প্রবেশ করেছে, তাও নিশ্চিত করা হয়নি। পরিকল্পিত আকাশপথের নজরদারির পর পরিস্থিতি ও নিম্নাঞ্চলের ঝুঁকি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/কেএইচ