দেশের পুঁজিবাজারে গত সপ্তাহজুড়ে ছিল ব্যাপক বিক্রিচাপ। প্রধান দুই শেয়ারবাজার- ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রায় সব প্রধান সূচকের পতনের মধ্য দিয়ে সপ্তাহ শেষ হয়েছে। সূচক কমার পাশাপাশি অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে এবং লেনদেনেও দেখা গেছে বড় ধরনের ভাটা। চার কার্যদিবসের এ সপ্তাহে বাজারের গভীরতা (ডেপথ), সূচকের গতি ও লেনদেনের পরিমাণ- তিন ক্ষেত্রেই দুর্বলতার চিত্র ফুটে উঠেছে।
গত সপ্তাহের ২৩ থেকে ২৭ আগস্টে সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৩০ দশমিক ৪ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৬৫৫ দশমিক ৬৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। একই সময়ে বাছাই করা কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস৩০ ১ দশমিক ২৮ শতাংশ কমে ২ হাজার ১৩৪ দশমিক ৮৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচকও ২ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে ১ হাজার ১৩২ দশমিক ৫৪ পয়েন্টে নেমেছে। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে এসএমই খাতের ডিএসএমইএক্স সূচক ১ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও ছিল একই ধরনের পরিস্থিতি। গত সপ্তাহে সিএসইর প্রধান সূচক ক্যাসপি ২ দশমিক ১০ শতাংশ কমেছে। সিএসই৩০ সূচক কমেছে শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং সিএসসিএক্স সূচক কমেছে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এ ছাড়া সিএসই৫০ সূচক ১ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং সিএসআই ২ দশমিক ২৩ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে সিএসএসএমইএক্স সূচকে, যা সপ্তাহে ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ কমেছে।
সূচকের পতনের পাশাপাশি বাজারের সার্বিক পরিস্থিতিও ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক। ডিএসইতে সপ্তাহে মাত্র ৩৫টি কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে। বিপরীতে ৩৪২টির দর কমেছে এবং ১১টির দর অপরিবর্তিত ছিল। এ ছাড়া ২৩টি সিকিউরিটিজে কোনো লেনদেন হয়নি। অর্থাৎ বাজারের পতন কেবল কয়েকটি বড় কোম্পানি বা নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং লেনদেন হওয়া বেশিরভাগ সিকিউরিটিজই বিক্রিচাপের মুখে পড়েছে। সিএসইতেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সপ্তাহে মোট ২৯৩টি সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২২৯টির দর কমেছে, বেড়েছে ৪৯টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১৫টির।
সাপ্তাহিক লেনদেনের গতি কমে যাওয়া বাজারের দুর্বলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ডিএসইতে গড় দৈনিক লেনদেন ৩৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে ৫৭১ কোটি ৭১ লাখ টাকায় নেমেছে। আগের সপ্তাহে গড় দৈনিক লেনদেন ছিল ৯০৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। চার কার্যদিবসে সপ্তাহের মোট লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ২৮৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যেখানে আগের সপ্তাহে পাঁচ কার্যদিবসে মোট লেনদেন ছিল ৪ হাজার ৫২৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। গড় দৈনিক লেনদেনের এই বড় পতন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও বাজারের তারল্য কমার ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে গড় দৈনিক লেনদেন হওয়া শেয়ারের পরিমাণও প্রায় ২৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ কমেছে।
খাতভিত্তিক লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বস্ত্র খাত ছিল সবচেয়ে সক্রিয়। সপ্তাহে ডিএসইর গড় দৈনিক লেনদেনে খাতটির অংশ ছিল ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। এরপর সাধারণ বীমা খাতের অংশ ১১ দশমিক ৭০ শতাংশ, ওষুধ ও রসায়ন খাতের ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ব্যাংক খাতের ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং প্রকৌশল খাতের ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ। তবে লেনদেনের অংশ বেশি হলেও অধিকাংশ খাতেই লেনদেন আগের সপ্তাহের তুলনায় কমেছে।
সপ্তাহে ডিএসইতে সর্বোচ্চ লেনদেন হওয়া শেয়ার ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। কোম্পানিটির শেয়ারে গড়ে ৩৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। এরপর সাইহাম টেক্সটাইল, রানার অটোমোবাইল, ফার কেমিক্যাল, এমএল ডাইং, লাভেলো, বেক্সিমকো, ব্র্যাক ব্যাংক, প্যাসিফিক টেক্সটাইল ও সামিট পাওয়ারের শেয়ারে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে। অন্যদিকে সিএসইতে সপ্তাহের সর্বোচ্চ টার্নওভার হয়েছে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলের শেয়ারে। এর পরের অবস্থানে ছিল ফাইন ফুডস, জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
সামগ্রিক বাজারের দুর্বলতার মধ্যেও কিছু শেয়ারে উল্লেখযোগ্য দর বৃদ্ধি হয়েছে। ডিএসইতে সপ্তাহের শীর্ষ দর বৃদ্ধিকারী ছিল মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, যার শেয়ারদর ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। ফাইন ফুডসের দর বেড়েছে ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, এসকোয়ার নিটের ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ, এমারেল্ড অয়েলের ৬ দশমিক ০৭ শতাংশ, সাইহাম টেক্সটাইলের ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং জিকিউ বলপেনের ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ।
সিএসইতেও ফাইন ফুডস, এমারেল্ড অয়েল, এসকোয়ার নিট কম্পোজিটসহ কয়েকটি শেয়ারে উল্লেখযোগ্য দর বৃদ্ধি দেখা গেছে। অন্যদিকে সপ্তাহের সবচেয়ে বড় দরপতন হয়েছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারে। ডিএসইতে কোম্পানিটির দর ২০ দশমিক ২৩ শতাংশ কমেছে।
এরপর আমরা টেকনোলজিসের দর ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ, ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক ফার্স্ট গ্রোথ ফান্ডের ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং তুং হাইয়ের দর ১৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমেছে। সিএসইতেও শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ ছিল সপ্তাহের শীর্ষ দরপতনকারী কোম্পানি; সেখানে শেয়ারটির দর ২১ দশমিক ৪০ শতাংশ কমেছে।
সার্বিকভাবে গত সপ্তাহের পুঁজিবাজারে প্রধান বার্তা ছিল বিক্রিচাপ ও লেনদেনের সংকোচন। প্রধান সূচকগুলোর পতন, অধিকাংশ শেয়ারের দর কমে যাওয়া এবং গড় দৈনিক লেনদেনে বড় পতন- এই তিনটি সূচকই বাজারের দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরেছে। যদিও কিছু নির্বাচিত শেয়ারে দর বৃদ্ধি ও সক্রিয় লেনদেন দেখা গেছে, তা এখনও সামগ্রিক বাজারে শক্তিশালী ইতিবাচক ধারায় ফেরার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
আগামী সপ্তাহে বাজারের গতিপথ নির্ধারণে সূচকের স্থিতিশীলতার পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণ এবং দর বৃদ্ধি ও দরপতনের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও