রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে তথ্য উঠে আসছে। প্রকাশ্যে ঘটছে দুর্ধর্ষ ছিনতাই। দিনের আলোতেই গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটছে। যত্রতত্র মিলছে খণ্ডিত মরদেহ। আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ভঙ্গুর অবস্থানে থাকা পুলিশ সদস্যরা গত দুই বছরেও পুরোপুরি সক্রিয় হতে পারেনি। আর এই সুযোগে বিস্তার ঘটেছে নানা ধরনের অপরাধের। অনলাইনেও ঘটছে নিত্যনতুন সাইবার ক্রাইম।
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন : সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শহরগুলোর মধ্যে অপরাধের হারের দিক থেকে শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার নাম। একই সঙ্গে এই শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্প্রতি বৈশ্বিক তথ্য পরিসংখ্যানভিত্তিক সংস্থা ‘নাম্বিও’ প্রকাশিত ২০২৬ সালের অপরাধ ও নিরাপত্তা সূচকে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
নাম্বিওর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার অপরাধ সূচক বর্তমানে ৬২ দশমিক ২, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব শহরের তুলনায় সর্বোচ্চ। বিপরীতে নিরাপত্তার দিক থেকে ঢাকার অবস্থান সবচেয়ে নিচে, শহরটির নিরাপত্তা সূচক মাত্র ৩৭ দশমিক ৮। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের বড় শহরগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ঢাকার চেয়ে ভালো।
বৈশ্বিক তালিকায় অপরাধপ্রবণ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ৫৯তম। অর্থাৎ অপরাধ ও নিরাপত্তার অভাবের দিক দিয়ে ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ ১৫ শতাংশ শহরের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দেশীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও উঠে আসছে ঢাকাসহ সারা দেশে ক্রমাবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) মাসিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জুলাই মাসে নারী ও শিশু সহিংসতার মোট ঘটনা ছিল ৩০৬টি। জুন মাসে ছিল ৩২০টি। অন্যদিকে জুনে যেখানে ৬৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল, জুলাই মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০টিতে। একইভাবে মানসিক চাপ, পারিবারিক সহিংসতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ১৭টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২৮টিতে পৌঁছেছে। তা ছাড়া যৌন নিপীড়ন বা হয়রানির ঘটনা বেড়ে ২২টিতে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে দলবদ্ধ ধর্ষণ (১৬ থেকে ৭টি), শারীরিক নির্যাতন (৫৬ থেকে ৪২টি) এবং সাধারণ হত্যার মতো (৭৬ থেকে ৫২টি) কিছু চরম অপরাধের সংখ্যা কিছুটা কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এমএসএফ তাদের জুনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, দেশে মব সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।
সংস্থাটি বলছে, জুনে সারা দেশে অন্তত ৭৮টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৩৩ জন নিহত এবং ১২৬ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এর আগের মাসে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৩২ এবং আহত ৭১ জন। সে হিসাবে আহতের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, জুনে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩০৩ জন আহত এবং দলীয় সংঘর্ষে ৭ জন নিহত হয়েছেন। সংগঠনটি বলছে, রাজনৈতিক সহিংসতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। দলীয় ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের হামলা; উভয় ক্ষেত্রেই হতাহতের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি থেকে বোঝা যায়, রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই সহিংস ও অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
ছিনতাইয়ের স্বর্গ ঢাকা : রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে বেড়েছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। সম্প্রতি উত্তরায় প্রধানমন্ত্রীর এক নিকটাত্মীয়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সোয়া কোটি টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
বর্তমানে ডিএমপির আট বিভাগে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৩৮৭ জন ছিনতাইকারী তৎপর রয়েছে। অথচ ছয় মাস আগেও রাজধানীতে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা ছিল ৯৮৯ জন। কয়েক মাসের ব্যবধানে ছিনতাইকারীর সংখ্যা প্রায় দেড় গুণ বেড়ে যাওয়া এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি ভাবিয়ে তুলেছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।
বর্তমানে সক্রিয় ছিনতাইকারীদের মধ্যে ডিএমপির রমনা বিভাগে ১৫২, লালবাগে ১৫৯, ওয়ারীতে ৩০৮, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ ও উত্তরায় ২৪০ জন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী রয়েছে। যাদের ৮০ শতাংশই এক থেকে সাতটি মামলার আসামি এবং একাধিকবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও ছিনতাইয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের বাইরে হাজারেরও বেশি ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে রাজধানীতে। যাদের অনেকই ভাসমান কিশোর ও মাদকাসক্ত। সুযোগ পেলেই ছুরি, চাপাতি অথবা সামুরাই নিয়ে ছিনতাই করে তারা।
রাজধানীতে তিন শতাধিক ছিনতাই স্পট রয়েছে। এর মধ্যে হটস্পটের সংখ্যা ৫৫টি। তেজগাঁওয়ে ছিনতাইয়ের হটস্পট সবচেয়ে বেশি। এরপরই রয়েছে মতিঝিল ও ওয়ারী। হটস্পট চিহ্নিত হওয়ার পরেও ছিনতাই ঠেকাতে না পারা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে জিডি না করায় অনেক ছিনতাইয়ের ঘটনাই অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে।
অপ্রতিরোধ্য কিশোর গ্যাং : রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কিশোর গ্যাং লিডার আকাশ। সাতবার গ্রেফতার হয়েও আট মাস আগে জামিনে বের হয় ১২ মামলার এই আসামি। চাপাতি-সামুরাই দিয়ে কুপিয়ে ছিনতাই করে আবারও আতঙ্ক ছড়ায় মোহাম্মদপুরে। সম্প্রতি আবারও গ্রেফতার হয় আকাশ। শুধু এক আকাশই নয়, রাজধানীসহ সারা দেশেই আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে কিশোর গ্যাং।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মারাত্মক সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যে বয়সে তাদের লেখাপড়ায় মনোযোগী হওয়ার কথা, ওই সময়ে তারা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিশোর অপরাধীদের অপরাধের সরকারি পৃথক কোনো তথ্যভান্ডার নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২২ সালে দেশে ১৭৩টি কিশোর গ্যাং অপরাধী চক্র ছিল। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩৭টিতে।
পুলিশের খাতায় এসব গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৩৮২ জন। এর মধ্যে রাজধানীতে এখনও সক্রিয় ১২৭টি কিশোর গ্যাং। এরা বিভিন্ন থানা এলাকায়, পাড়া-মহল্লায় ছোট-বড় গ্রুপে নানা অপরাধে জড়িত। এদের বড় ভাইদের ভূমিকায় রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু নেতা। এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ইভটিজিং, ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধেও জড়ায়।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অধিকাংশ মামলা বেইলেবল। যে কারণে দীর্ঘ সময় তাদের আটকে রাখা যায় না। অনেক সময় তাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ার কারণে জামিন হয়ে যায়। এসব মামলায় অনেক সময় আদালতে সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে আসে না। যার ফলে বিচার আটকে থাকে। শিশুদের জন্য আলাদা আদালত করা উচিত। শুধু নারী ও শিশু নয়, শিশুদের জন্য আলাদা আদালত হলে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব।
লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড : রাজধানীসহ সারা দেশে খুন বেড়েছে। একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা উঠে এসেছে ভুক্তভোগীদের বয়ানে। দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
সম্প্রতি রাজধানীর দুটি স্থান থেকে দুজনের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পেশাদার খুনি দিয়ে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে রাজধানীতে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্যমতে গত দুই মাসে রাজধানীতে ৫৪টি এবং সারা দেশে ৬২৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন সরকার গঠনের পর পুলিশ কিছুটা দ্বিধায় কাজ করছে, ফলে অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে রাজধানীর কিছু এলাকায় অপরাধীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অপরাধী নেটওয়ার্কের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
কিশোর অপরাধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার দায়িত্ব নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে এ জন্য একত্রে কাজ করতে হবে।
সময়ের আলো/এসএকে