সরকারি চাকরিজীবী ও অবসর সুবিধাভোগীদের প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে আজ সোমবার। মন্ত্রিসভার অনুমোদন করলে শুরু হবে প্রজ্ঞাপন জারির কাজ, যার জন্য এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে সচিব কমিটি যে বেতন স্কেল প্রস্তাব করেছে তার তেমন কোনো রদবদল না করেই পে-স্কেল চূড়ান্ত হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
দীর্ঘ ১১ বছর পর বেতন কাঠামো পুনর্গঠনের অপেক্ষায় আছেন ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনায় সর্বনিম্ন বেতন বাড়ানো, মহার্ঘ ভাতা ও স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। ২০১৫ সালের পর এই প্রথম বেতন কাঠামো বড় আকারে পরিবর্তন হতে যাচ্ছে।
এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিসভায় পে-স্কেল ওঠার আগে গতকাল রোববার এ-সংক্রান্ত সচিব কমিটি সবশেষ বৈঠকে বসেছিলেন। পে-স্কেলের প্রস্তাবনায় কোনো অসঙ্গতি আছে কি না বা ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে কি না শেষ সময়ে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এ ছাড়া সোমবার মন্ত্রিসভায় নতুন পে-স্কেল পাস হওয়ার পর কবে নাগাদ প্রজ্ঞাপন জারি করা যেতে পারে সে ব্যাপারেও আলোচনা হয় বলে বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক কর্মকর্তা সময়ের আলোকে নিশ্চিত করে বলেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল রোববার সময়ের আলোকে বলেন, ‘পে-স্কেল চূড়ান্ত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে ইতিমধ্যেই। এখন এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আশা করছি সোমবার (আজ) যে মন্ত্রিসভার বৈঠক হবে সেখানেই নতুন পে-স্কেল অনুমোদন হয়ে যাবে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সর্বোচ্চ এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি হয়ে যাবে। আর এর মাধ্যমেই সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে।’
তিনি আরও বলেন, সচিবালয় থেকে শুরু করে সব সরকারি দফতরে কর্মরতদের এখন নজর পে-স্কেল। অফিসে এসে সবার মুখেই এখন পে-স্কেল নিয়েই আলোচনা। আমরা যেহেতু অর্থ মন্ত্রণালয়ে কাজ করছি-তাই অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও দফতরে কর্মরতরা আমাদের কাছে জানতে চান কবে চূড়ান্ত হবে পে-স্কেল। বেতন কত টাকা বাড়বে, কবে থেকে কার্যকর হবে- এ রকম নানা প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে প্রতিদিন। আমরা শুধু বলছি- আকাশে চাঁদ উঠলে সবাই দেখতে পাবেন। তবে যে নতুন বেতন কাঠামো আসতে যাচ্ছে তাতে বেশ ভালো কিছুই থাকবে বলে আমরা জানতে পারছি।
জানা যায়, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে এই কমিটি নতুন কাঠামোর বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসন সচিব, আইনসচিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়েছেন।
নবম জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে সচিব কমিটি মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশের মধ্যে রাখার সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নতুন কাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে মূল বেতন কার্যকর এবং পরবর্তী অর্থবছর থেকে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা সমন্বয়ের প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন কাঠামোর সুবিধা কার্যকর করার ঘোষণা আগেই দেওয়া হলেও তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। নবম বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী তাদের জন্য নতুন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথে যাচ্ছে সরকার।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনপ্রশাসন-নিট খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বরাদ্দ বেড়েছে ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের হিসাবে, এই বাড়তি অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নে ব্যয় হতে পারে।
বর্তমান অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা। প্রায় ১১ বছর ধরে একই কাঠামোয় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জোরালো হয়। গত ১১ জুন বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন।
মন্ত্রিসভা আজ এ প্রস্তাবটি অনুমোদন করলে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক পথ খুলবে। তবে চূড়ান্ত বেতন হার, ভাতা ও বাস্তবায়নের সময়সূচি মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে।
প্রস্তাবনার খসড়ায় মূল বিষয় ৫টি : অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবনার খসড়ায় ৫টি মূল বিষয় রয়েছে। বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে নিচের গ্রেডগুলোতে।
এ ছাড়া মহার্ঘ ভাতা ও স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়প্রতি বছর মূল্যস্ফীতির ভিত্তিতে বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমন্বয়ের প্রস্তাব রয়েছে। যাতে প্রতি ৫ থেকে ৮ বছর পর নতুন পে-স্কেলের জন্য আন্দোলন করতে না হয়। ভাতা পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে বাড়ি ভাড়া ভাতার ক্ষেত্রে প্রস্তাব করা হয়েছে বর্তমান ৪০-৫৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০-৬০ শতাংশ, চিকিৎসা ভাতা ১৫০০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকা, শিক্ষা ভাতা ১ সন্তানের জন্য ১০০০, ২ সন্তানের জন্য ২০০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রেড কাঠামো ২০টি গ্রেড বহাল থাকছে। তবে গ্রেডের মধ্যে বেতন ব্যবধান কমিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। যাতে উচ্চ-নিম্ন গ্রেডের বৈষম্য কিছুটা কমে।
এ ছাড়া পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ইতিমধ্যে সুপারিশ জমা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সচিব কমিটি। দুই ধাপে এটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে। প্রথম বছরে মূল বেতন এবং দ্বিতীয় বছরে বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর হতে পারে।
কোন গ্রেডে কত প্রস্তাব : নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী দ্বিতীয় গ্রেডে ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার, তৃতীয় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০, চতুর্থ গ্রেডে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০, পঞ্চম গ্রেডে ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ এবং ষষ্ঠ গ্রেডে ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা হতে পারে।
সপ্তম গ্রেডে ৫৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮০০, অষ্টম গ্রেডে ৪৭ হাজার ২০০ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭০০, নবম গ্রেডে ৪৫ হাজার ১০০ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ এবং ১০ম গ্রেডে ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
এদিকে সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কেন নতুন পে-স্কেল দরকার : মূলত মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকার নতুন পে-স্কেল দিতে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে চালের কেজি ছিল ৪০ টাকা। এখন ৭০ টাকা। তেল, ডাল, মাছ সবকিছুর দাম প্রায় দ্বিগুণ। অথচ বেতন একই। ফলে ক্রয়ক্ষমতা ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি- বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ফেডারেশন গত দুই বছর ধরে মানববন্ধন, স্মারকলিপি দিয়ে আসছে। তাদের দাবি ছিল সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা।
বেসরকারি খাতের সঙ্গে ব্যবধান কমানোও আরেকটি লক্ষ্য। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংক, এনজিও, বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি প্রবেশের ক্ষেত্রেই বেতন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অথচ সরকারিতে তা ১২-১৪ হাজার টাকা। ফলে মেধাবীরা সরকারি চাকরিতে আসতে চাচ্ছে না- এ জন্য সরকারি চাকরির বেতন বাড়ানো দরকার। তা ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও বড় একটি কারণ।
সময়ের আলো/এসএকে