ডায়াবেটিস মানেই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ। ডায়াবেটিসের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু রক্তে শর্করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকসহ বিভিন্ন ধরনের কার্ডিওভাসকুলার জটিলতার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি। তাই একজন ডায়াবেটিস রোগীর চিকিৎসায় শুধু রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দেখা যথেষ্ট নয়, হৃদরোগের ঝুঁকিগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়।
দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে রক্তনালির ভেতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে শরীরে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং চর্বি বিপাকের পরিবর্তন ঘটে। ধীরে ধীরে রক্তনালির দেয়ালে চর্বি জমে রক্তনালি সরু হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থাকে অ্যাথেরোসেক্লরোসিস বলা হয়। ফলে হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহ কমে গিয়ে করোনারি হৃদরোগ এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। একই ধরনের পরিবর্তন মস্তিষ্কের রক্তনালিতে হলে স্ট্রোকের আশঙ্কাও বাড়তে পারে।
ডায়াবেটিসের সঙ্গে অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ওজন এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা একসঙ্গে থাকে। এসব ঝুঁকি যখন একসঙ্গে উপস্থিত থাকে, তখন হৃদরোগের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। তাই ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে শুধু রক্তের সুগার পরীক্ষা করলেই হবে না। নিয়মিত রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ওজন এবং কিডনির কার্যকারিতার দিকেও নজর দিতে হবে।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। ডায়াবেটিসে স্নায়ুর কার্যকারিতায় পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে হৃদরোগের উপসর্গ সবসময় প্রচলিতভাবে প্রকাশ নাও পেতে পারে। কারও বুকের তীব্র ব্যথা নাও থাকতে পারে, বরং অস্বাভাবিক ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা বা বমিভাবের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই এসব লক্ষণকে শুধু গ্যাস বা সাধারণ দুর্বলতা ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
বিশেষ করে ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, ধূমপানের অভ্যাস বা পারিবারিক হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করতে হবে এবং নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে শাকসবজি, ডাল, আঁশযুক্ত খাবার এবং পরিমিত পরিমাণে স্বাস্থ্যকর প্রোটিন খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। খাবারের পরিমাণ এবং মোট ক্যালরি গ্রহণের দিকেও নজর দিতে হবে।
আমি রোগীদের নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের ওপরও গুরুত্ব দিতে বলি। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও অন্যান্য রোগ বিবেচনা করে হাঁটা বা উপযুক্ত ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে করে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ওজন, রক্তচাপ ও হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকার পাওয়া যায়। তবে যাদের আগে থেকেই হৃদরোগ বা অন্য কোনো জটিলতা রয়েছে, তাদের ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা উচিত। একই সঙ্গে ধূমপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে।
ধূমপান হৃদরোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। তাই ডায়াবেটিস থাকলে ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টাও করতে হবে।
ডায়াবেটিস মানেই হৃদরোগ হবে, এমন নয়। তবে ডায়াবেটিসকে অবহেলা করলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি। তাই নিয়মিত রক্তে শর্করা ওএইচবিএওয়ানসি পরীক্ষা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কিডনি ও হৃদযন্ত্রের পরীক্ষা করা উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরলের ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য শুধু সুগার কমিয়ে রাখা নয়। দীর্ঘমেয়াদে হৃদযন্ত্র, কিডনি, চোখ, স্নায়ু ও অন্যান্য অঙ্গকে সুরক্ষিত রাখাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সচেতনতা, নিয়মিত চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই পারে ডায়াবেটিসের সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
সময়ের আলো/জেডি