সুস্বাস্থ্যের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম খুব জরুরি। ঠিকমতো ঘুম না হলে আমরা ক্লান্তি অনুভব করি। তারওপর যদি সারাদিন পরিশ্রম করতে হয়, তাহলে আরও বেশি ক্লান্ত লাগে। কিন্তু, এমন কি কোনো খাবার আছে, যা ঘুমের অভাব পূরণ করতে পারে?
উত্তর হলো, নাহ্, নেই। তবে, এমন কিছু খাবার আছে, যা আমাদের ভালো ঘুম আসতে সাহায্য করে। একইসঙ্গে ক্লান্তি দূর করতে ও শরীরে শক্তি যোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পুষ্টিবিদদের মতে, শরীরে কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হলে আমরা ক্লান্তি অনুভব করি। এমন কিছু ভিটামিন ও খনিজ আছে, যা আমাদের শরীরের জন্য স্বল্পমাত্রায় হলেও দরকার। একে বলা বয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস। এসব পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হলে মস্তিষ্কে ধোঁয়াশা তৈরি হতে পারে, শরীর সহজেই ক্লান্ত হতে পারে, দেখা দিতে পারে আরও নানা সমস্যা।
জানা জরুরি, কোন কোন উপাদানের অভাবে আমরা ক্লান্ত হই এবং কোন কোন খাবার আমাদের সেই পুষ্টি জোগাবে।
ভিটামিন বি
কার্বোহাইড্রেট এবং ফ্যাট থেকে শক্তি বা এটিপি উৎপাদনে ভিটামিন বি-এ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কারণে ভিটামিনটির অভাব হলে শক্তি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তখন শরীর ক্লান্ত লাগে। দুধ, পনির, দইসহ বিভিন্ন রকম বাদামে ভিটামিন বি পাওয়া যায়।
প্রোটিন
পেশি সবল রাখতে ও শক্তি জোগাতে প্রোটিন খুবই জরুরি। দিনের পর দিন প্রোটিনের অভাব হলে পেশিতে জমা থাকা প্রোটিন ভাঙতে শুরু করে, বার বার খিদে পায়। এতে আমরা দুর্বল বোধ করি। প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে দৈন্দিন খাদ্যতালিকায় মাছ, মাংস, ডিম, পনির, ডাল, দুধ ও সয়াবিন রাখুন।
ইলক্ট্রোলাইটস
পানি কম খেলে এবং সোডিয়াম-পটাশিয়ামের অভাব হলে শরীরে ইলেক্ট্রোলাইটসের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতেও ক্লান্ত লাগে, শারীরবৃত্তীয় কাজ বাধাপ্রাপ্ত হয়। পানিশূন্যতা রোধে ডাবের পানি, রসালো ফল, তরমুজ ও শসা খান।
ম্যাগনেশিয়াম
ম্যাগনেশিয়ামের অভাব হলে ঘুমের সমস্যার পাশাপাশি পেশিতে টান ধরতে পারে। এতে শরীর ক্লান্ত লাগে। এর ঘাটতি পূরণে কুমড়োর বীজ,কাঠবাদাম ও কাজুবাদাম খেতে পারেন।
এছাড়া, ভিটাবিন বি কিংবা প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে টক দই, পনির, ছোলা ও মুগ ডাল খেতে পারেন। আমিষের ঘাটতি মেটাতে খেতে হবে ডিম, মাছ ও মাংস। শরীরে পানিশূন্যতা দূর করতে এবং ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষায় ডাবের পানি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, সোডিয়াম-পটাশিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখতে প্রতিদিন কলা খেতে পারেন । ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখতে খাদ্যতালিকায় রাখুন বাদাম কিংবা কুমড়োর বীজ।
কোন কোন খাবারে অনিদ্রা হতে পারে সেটিও জেনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রুসিফেরাস সবজি
বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি ও ব্রাসেলস স্প্রাউটসের মতো সবজি পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এসব সবজি হজম হতে বেশি সময় নেয় এবং অন্ত্রে গ্যাস বা পেট ফাঁপার সমস্যা তৈরি করতে পারে। ঘুমানোর আগে বেশি পরিমাণে এসব সবজি খেলে পেটে অস্বস্তি হতে পারে। তাই যাদের গ্যাস বা পেট ফাঁপার প্রবণতা রয়েছে, তারা এসব সবজি দিনের বেলায় খেতে পারেন।
শিমজাতীয় খাবার
বরবটি, মটরশুঁটি, বিভিন্ন ধরনের শিমজাতীয় খাবারে প্রচুর ফাইবার ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন থাকে। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণে বা ঘুমানোর কিছুক্ষণ আগে খেলে অনেকের গ্যাস ও পেট ফাঁপার সমস্যা হতে পারে। তাই রাতের খাবারে এসব খাবার রাখলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
বেশি প্রোটিন ও ভারী খাবার
রাতের খাবারে অতিরিক্ত মাংস, চর্বিযুক্ত খাবার বা ভারী প্রোটিনসমৃদ্ধ পদ খেলে হজমে সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে খাবারের পর দ্রুত বিছানায় চলে গেলে পেট ভার লাগা, অস্বস্তি কিংবা বুকজ্বালার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই রাতে পরিমাণে ভারী খাবারের বদলে সহজপাচ্য ও পরিমিত খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
টক বা সাইট্রাস ফল
কমলা, লেবু, গ্রেপফ্রুটের মতো সাইট্রাস ফলে নানা পুষ্টি উপাদান থাকলেও এগুলো সবার জন্য রাতে উপযোগী নয়। যাদের অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালার সমস্যা রয়েছে, তারা রাতে এসব ফল খেলে অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন।
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
ঘুমানোর আগে অনেকে গরম দুধ খান। তবে, এটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করে না। বিশেষ করে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকলে দুধ, দই বা অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার খেয়ে গ্যাস, পেট ব্যথা কিংবা পেট ফাঁপার সমস্যা হতে পারে।
চা, কফি ও নিকোটিন
ঘুমের আগে চা, কফি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। এছাড়া, নিকোটিন থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন। নিকোটিন ঘুম ক্ষতিগ্রস্ত করে।
কোন কোন খাবার ভালো ঘুমে সাহায্য করতে পারে
সম্প্রতি আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে খাবারের ধরন ও ঘুমের মানের মধ্যে সম্পর্ক খোঁজা হয়।
গবেষকেরা প্রায় ১৩০ ধরনের খাবারের পুষ্টিগুণ নিয়ে বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, একজন মানুষ দিনে মোট কতটা প্রোটিন খাচ্ছেন, শুধু সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং প্রোটিনটি কোন উৎস থেকে আসছে, সেটিও ঘুমের মানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভালো ঘুমের ক্ষেত্রে মেলাটোনিন গুরুত্বপূর্ণ একটি হরমোন। শরীরে ট্রিপটোফান নামের একটি অ্যামাইনো অ্যাসিড থেকে মেলাটোনিন তৈরি হয়। বিভিন্ন প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারেই ট্রিপটোফান পাওয়া যায়।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উদ্ভিজ্জ প্রোটিনে থাকা কিছু উপাদান ট্রিপটোফানকে মস্তিষ্কে পৌঁছাতে তুলনামূলকভাবে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে মেলাটোনিন তৈরির প্রক্রিয়া বাড়তে পারে এবং ঘুম আরও গভীর ও আরামদায়ক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
অন্যদিকে, প্রাণিজ প্রোটিনে ট্রিপটোফানের পাশাপাশি অন্যান্য অ্যামাইনো অ্যাসিডও থাকে। এগুলোর উপস্থিতি কিছু ক্ষেত্রে ট্রিপটোফানের মস্তিষ্কে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। ফলে, ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোন তৈরির প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতে পারে।
রাতের খাবারে ডাল, মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা, সয়া জাতীয় খাবার ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি রাখতে পারেন। এগুলো উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ভালো উৎস।
তুলনামূলক হালকা ও সহজপাচ্য খাবার রাতে খেলে পেটে অতিরিক্ত ভারীভাব বা অস্বস্তি কম হতে পারে। বিশেষ করে গরমের সময়ে হালকা নিরামিষ খাবার অনেকের জন্য আরামদায়ক হতে পারে।
প্রাণিজ প্রোটিনের মধ্যে রেড মিট বা লাল মাংস নিয়ে কিছুটা বেশি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। গরু ও খাসির মাংস বেশি পরিমাণে খেলে অনেকের অম্বল, বদহজম বা পেট ভার লাগার মতো সমস্যা হতে পারে। রাতে এ ধরনের অস্বস্তি হলে স্বাভাবিকভাবেই ঘুমের মান খারাপ হতে পারে।
তবে সব প্রাণিজ প্রোটিনকে একইভাবে দেখার সুযোগ নেই। মাছ, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এবং মুরগির মাংসের মতো তুলনামূলক লিন প্রোটিন পরিমিত পরিমাণে খেলে একই ধরনের সমস্যা নাও হতে পারে।
এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস ভালো ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের আলো/মহু