নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন ‘বড় সরদার বাড়ি’। এই অমূল্য প্রত্নসম্পদে ‘কোক স্টুডিও বাংলা’ সিজন-৪-এর শুটিংয়ের অনুমতি দেওয়ার ফলে স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে সোনারগাঁয়ে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগষ্ট) দুপুরে সোনারগাঁ জাদুঘরের ১ নম্বর গেটের সামনে ‘সুবর্ণগ্রাম সংস্কৃতি অঙ্গন’ ও ‘সুজন সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর যৌথ উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সোনারগাঁ বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম সূতিকাগার। প্রায় পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ি জাতীয় প্রত্নসম্পদের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। অথচ জনপ্রিয় মিউজিক্যাল প্রজেক্ট ‘কোক স্টুডিও বাংলা’ সিজন-৪-এর শুটিংয়ের জন্য এই সংরক্ষিত স্থাপনাটি মাত্র ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়া দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এমন তথ্য ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে।
বক্তারা আরও জানান, বিশেষজ্ঞদের সুস্পষ্ট নিষেধ ও আপত্তি সত্ত্বেও শুটিংয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শুটিংয়ের নামে গত চার দিন ধরে ঐতিহাসিক এই বাড়িটিতে ভারী লাইটিংয়ের সরঞ্জাম, বড় বড় জেনারেটর এবং শুটিংয়ের নানা ভারী জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়েছে। স্থাপনার দেওয়াল ও কাঠামোগত অংশে পেরেক, গজাল এবং রড ঠুকে দৃশ্যমান ক্ষতিসাধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
'সোনারগাঁয়ের ইতিহাস ঐতিহ্য ও প্রত্ন সম্পদ সংরক্ষণ কমিটি'র আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস তার বক্তব্যে বলেন, বড় সরদার বাড়িটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পুনর্নির্মাণের জন্য অতীতে প্রায় ২৫ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এমন একটি স্পর্শকাতর ও জাতীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা কীভাবে নামমাত্র মূল্যে বাণিজ্যিক শুটিংয়ের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। শুটিংয়ের ফলে সৃষ্ট দৃশ্যমান ক্ষতির পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত কাঠামোগত কোনো বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে কি না, তা প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করার দাবি জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, বড় সরদার বাড়ি শুধু ইট-কাঠের কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়; এটি সোনারগাঁয়ের হাজার বছরের ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। বাণিজ্যিক স্বার্থে এই জাতীয় সম্পদকে ব্যবহার করার পেছনে কোনো সিন্ডিকেট জড়িত কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের কথাও তুলে ধরেন এবং তা তদন্তে কোনো ধরনের প্রশাসনিক প্রভাব বা হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন। একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে প্রকৃত সত্য উন্মোচন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সুবর্ণগ্রাম সংস্কৃতি অঙ্গনের সভাপতি কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েসের সভাপতিত্বে এবং সুজন সোনারগাঁও শাখার সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মামুনের সাবলীল সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, সুবর্ণগ্রাম সংস্কৃতি অঙ্গনের সহসভাপতি কবি রহমান মুজিব এবং সুজন সুশাসনের জন্য নাগরিক নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল। এ ছাড়া স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য দেন।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম বলেন, আমরা সঠিক ও নিয়মানুসারেই কোক স্টুডিওর কাছে ৬ লাখ টাকা ভাড়ায় বড় সরদার বাড়িটি ভাড়া দিয়েছিলাম। তবে বড় সরদার বাড়িটি ভাঙ্গার বিষয়টি সঠিক নয়। শুটিংয়ের ফলে এমন অবস্থা হয়নি এমন অবস্থা পূর্বেই ছিলো। তারপরেও আমরা আমাদের নিয়মানুযায়ী মেইনটেইনেন্স কাজ পরিচালনা করছি।
সময়ের আলো/আতা