‘কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪’-এর ভিডিও ধারণ ও কোকা-কোলার বিজ্ঞাপন তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও জাদুঘরের ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ি। এ সময় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর, ভারী ক্যামেরা, আলোকসজ্জা ও সাউন্ড সিস্টেমসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি।
শনিবার (২৯ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগই জানান তারা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সোনারগাঁয়ের ইতিহাস ঐতিহ্য ও প্রত্ন সম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস। লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, সম্প্রতি চার দিনের জন্য ‘কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪’-এর ভিডিও ধারণ ও কোকা-কোলার বিজ্ঞাপন তৈরির সময় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর, ভারী ক্যামেরা, আলোকসজ্জা ও সাউন্ড সিস্টেমসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সোনারগাঁও জাদুঘরের ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ি। শুটিংয়ের পর ভবনের দেয়াল, অলংকরণ ও নকশার বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতি এবং দ্বিতীয় আঙিনার কাছে একটি অংশ ভেঙে গেছে।
এসময় শুটিংয়ের আগে হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছিল কি না এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় মতামত ও অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না। শুটিংয়ের অনুমোদন, আর্থিক লেনদেন এবং ভবনের শুটিং-পূর্ব ও পরবর্তী অবস্থার নথিও প্রকাশের দাবি জানানো হয় সংগঠনটির পক্ষ থেকে।
চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, ঐতিহাসিক সোনারগাঁ জাদুঘর ও বড় সর্দারবাড়ির গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অবহেলা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে এর ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসময়, মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকলে তার কারণ প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি বড় সর্দারবাড়ির ক্ষতি ও সংশ্লিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের দাবিও জানান।
শাহেদ কায়েস বলেন, বড় সরদার বাড়ির ক্ষতি হলে তা পুনরায় নির্মাণ করে শত শত বছরের ইতিহাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। একইভাবে প্রকৃত কারুশিল্পীদের বঞ্চিত রেখে দেশের লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন।
সংবাদ সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থাপনা ও ঐতিহাসিক ভবনে বাণিজ্যিক শুটিং, বিজ্ঞাপন ও ভারী সরঞ্জাম ব্যবহারের আগে হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা, স্বাধীন সংরক্ষণ স্থপতি ও প্রত্নসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ভবনটির জরুরি কারিগরি পরিদর্শন, তদন্তে কেউ দায়ী সাব্যস্ত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা পুনরুদ্ধারের পাশপাশি মোট ১২ দফা দাবি জানানো হয়।
এসময় ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম, সহকারী পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রকৌশলী হানিফ আহমেদ এবং গাইড লেকচারার আশরাফুল আলম নয়নের বিরুদ্ধে বেশ কিছু আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়া প্রায় অর্ধকোটি টাকার অনুষ্ঠান আয়োজন, ভুয়া বিল ও চেকের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, অনুমোদন ছাড়া তিন কোটি টাকার বেশি ব্যয়, নির্মাণ ও মেরামতে অতিরিক্ত বিল এবং শ্রমিক ও কাঁচামালের নামে ভুয়া বিল তৈরির অভিযোগও করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক কবি রহমান মুজিব, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট-এর সহ-সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল, সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতন-এর শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক লেখক মোয়াজ্জেনুল হক।
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ রক্ষায় গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী, প্রত্নতত্ত্ববিদ, স্থপতি, গবেষক, কারুশিল্পী ও সচেতন নাগরিকদের পাশে থাকার আহ্বানও জানানো হয় এই সংবাদ সম্মেলন থেকে।
সময়ের আলো/আতা