অটোরিকশার লোভে চালক খুন, রুদ্ধশ্বাস কাহিনির আদ্যোপান্ত

সময়ের আলো ডেস্ক

সারাদেশ

২১ আগস্ট ২০২৬। ভোর সাড়ে ৫টা। শিবগঞ্জের আকাশে তখনো পুরোপুরি আলো ফোটেনি। চারপাশে নীরবতা। প্রতিদিনের মতো অটোরিকশা নিয়ে জীবিকার সন্ধানে

2026-08-30T23:13:42+00:00
2026-08-30T23:13:42+00:00
 
  রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬,
১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
অটোরিকশার লোভে চালক খুন, রুদ্ধশ্বাস কাহিনির আদ্যোপান্ত
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৩ পিএম 
অটোরিকশার লোভে চালক খুন, রুদ্ধশ্বাস কাহিনির আদ্যোপান্ত। ছবি : সংগৃহীত
২১ আগস্ট ২০২৬। ভোর সাড়ে ৫টা। শিবগঞ্জের আকাশে তখনো পুরোপুরি আলো ফোটেনি। চারপাশে নীরবতা। প্রতিদিনের মতো অটোরিকশা নিয়ে জীবিকার সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন ২৩ বছরের রুমন আলী। স্ত্রী নাজমা সুলতানাকে রেখে বের হওয়া সেই সকালটিই হয়ে ওঠে তার জীবনের শেষ সকাল।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের ভাষ্য, অটোরিকশাটি হাতিয়ে নিতে পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তির পরিকল্পিত ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারান রুমন। কম দামে শক্তিশালী লিথিয়াম ব্যাটারি দেওয়ার কথা বলে তাকে শিবগঞ্জের পুঁটিমারি বিলের নির্জন এলাকায় ডেকে নেওয়া হয়। এরপর চোখ বেঁধে আখক্ষেতের ভেতরে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যার পর রুমনের অটোরিকশাটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। তবে অপরাধীরা যে বিষয়টি হিসাবের বাইরে রেখেছিল, তা হলো পুলিশের অনুসন্ধান।

পুলিশ জানায়, ২১ আগস্ট সকাল ৬টার দিকে শিবগঞ্জ পৌরসভার কানসাট এলাকা থেকে অটোরিকশাসহ নিখোঁজ হন রুমন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি করা হয়।

এরপর রুমনের শেষ অবস্থান, চলাফেরা, যোগাযোগ, অটোরিকশার গতিপথসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ শুরু করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ।

তদন্তের একপর্যায়ে সন্দেহের কেন্দ্রে আসে রুমনের পূর্বপরিচিত শাওন ও রহমান (ছদ্মনাম)। তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, রুমনকে অল্প দামে একটি শক্তিশালী লিথিয়াম ব্যাটারি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল শাওন। বলা হয়েছিল, একবার চার্জ দিলে ব্যাটারিটি দিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ যাওয়া যাবে।

অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা রুমনের কাছে প্রস্তাবটি আকর্ষণীয় মনে হয়। ব্যাটারি নিতে শাওনের সঙ্গে পুঁটিমারি বিলের দিকে রওনা হন তিনি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বায়োগ্যাস প্লান্টের কাছাকাছি একটি খেজুরগাছের নিচে অটোরিকশা রেখে শাওন রুমনকে পাটক্ষেতের আইল ধরে আখক্ষেতের ভেতরে নিয়ে যায়। সেখানে ব্যাটারি লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়।

জায়গাটি যেন রুমন আগে থেকে দেখে ফেলতে না পারেন—এই অজুহাতে তার চোখ বেঁধে দেওয়া হয়।

এরপর আখক্ষেতের নির্জন স্থানে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।

পুলিশ জানায়, রুমনকে হত্যার পর তার মরদেহ আখক্ষেতের গভীরে ফেলে রেখে অটোরিকশাটি নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় শাওন।

পরে অটোরিকশাটি বিক্রির জন্য রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। রহমান সেটি শফিকুলের (ছদ্মনাম) কাছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে। এর মধ্যে ৭০ হাজার টাকা শাওনকে দেওয়া হয় এবং বাকি টাকা নিজের কাছে রাখে রহমান।

তদন্তে এই তথ্য পাওয়ার পর শফিকুলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে রুমনের অটোরিকশাটি উদ্ধার করে পুলিশ।

অটোরিকশা উদ্ধার হলেও তখনো অজানা ছিল রুমনের অবস্থান।

তিন আসামিকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয় পুলিশ। তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে শাওন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৬ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টার দিকে শিবগঞ্জ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পুঁটিমারি বিল এলাকায় অভিযান চালানো হয়।

আখক্ষেতের গভীরে গিয়ে শাওনের দেখানো স্থান থেকে উদ্ধার করা হয় রুমনের মরদেহ।

পুলিশ জানায়, কয়েক দিন ধরে পড়ে থাকায় মরদেহের স্বাভাবিক চেহারায় পরিবর্তন এসেছিল। ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাসুয়াসহ প্রয়োজনীয় আলামত জব্দ করা হয়।

পরে শাওন বিজ্ঞ আদালতে স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

স্বামীর মুখ নয়, ব্যবহৃত জিনিস দেখে শেষবারের মতো চিনলেন নাজমা

রুমনের মৃত্যুর খবর তার পরিবারকে যে শূন্যতার মুখোমুখি করেছে, তদন্তের বাইরে সেই গল্পটিও পুলিশের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রুমনের স্ত্রী নাজমার সামনে তার ব্যবহৃত জুতা, প্যান্ট ও পকেটে থাকা মোবাইল ফোনসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তুলে দেওয়া হয়।

স্বামীকে জীবিত অবস্থায় শেষবারের মতো দেখতে পারেননি নাজমা। পরিচিত মানুষটিকে শেষবারের মতো চিনেছেন তার ব্যবহৃত জিনিস দেখে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের ভাষ্য, একটি অটোরিকশা হাতিয়ে নেওয়ার লোভেই পরিকল্পিতভাবে রুমনকে হত্যার ঘটনায় তার পরিবার একজন স্বামী, একজন স্বজন ও একজন উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়েছে।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ বলছে, রুমন নিখোঁজ হওয়ার পর ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করা হয়। নিখোঁজ অটোরিকশা উদ্ধার, সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও আটক, জিজ্ঞাসাবাদ, আদালতের মাধ্যমে রিমান্ড এবং আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য, অপরাধীরা যত পরিকল্পনাই করুক, অপরাধের আলামত ও তথ্য-প্রমাণের সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নিলে সত্য বেরিয়ে আসে।

রুমন আর ফিরবেন না। তার পরিবারও ফিরে পাবে না হারানো মানুষটিকে। তবে পুলিশের অনুসন্ধানে অন্তত সেই অনিশ্চয়তার অবসান হয়েছে—কোথায় নিখোঁজ হয়েছিলেন রুমন, কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছিল এবং কারা তাকে শেষবারের মতো সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল, তার উত্তর এখন তদন্তের নথিতে।

একটি অটোরিকশার জন্য ২৩ বছরের এক তরুণের জীবন কেড়ে নেওয়ার এই ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ।

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   খুন 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: