সেবা ডিজিটাল হলেও দৌড়াতে হয় দফতরে

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটলেও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে এর পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না নাগরিকরা। অনলাইনে আবেদন করার পরও কাগজপত্র জমা, স্বাক্ষর,

2026-09-01T02:33:28+00:00
2026-09-01T02:33:28+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
সেবা ডিজিটাল হলেও দৌড়াতে হয় দফতরে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৩৩ এএম 
সময়ের আলো গ্রাফিক
ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটলেও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে এর পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না নাগরিকরা। অনলাইনে আবেদন করার পরও কাগজপত্র জমা, স্বাক্ষর, ফি পরিশোধসহ বিভিন্ন কাজে অনেককেই আবার সরকারি দফতরে গিয়ে হাজির হতে হচ্ছে। ফলে ডিজিটাল সেবার নামে অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন ও ম্যানুয়াল- দুই ব্যবস্থাই একসঙ্গে চালু রয়েছে। এতে নাগরিকদের সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি ভোগান্তি, হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগও তৈরি হচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক গবেষণায় স্থানীয় সরকার পর্যায়ের ই-গভর্ন্যান্সের এমন চিত্র উঠে এসেছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘ই-গভর্ন্যান্স অ্যাট দ্য লোকাল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউশন্স : কারেন্ট স্টেট অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক সংলাপে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় দেশের আট বিভাগের ২ হাজার ৬১১ জন নাগরিক এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ২৯৭টি সরকারি দফতর থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে নারী, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছিল। গবেষণাটি ইউএসএআইডি, সুইজারল্যান্ড, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় পরিচালিত হয়।

গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা ফেলো তামিম আহমেদ ও গবেষণা সহযোগী সাবিনা শারমিন। গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে অনেক সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নেওয়া হলেও পুরো প্রক্রিয়া এখনও অনলাইনে সম্পন্ন করার সুযোগ সীমিত। গবেষণার একটি হিসাবে নারীদের মাত্র ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং তরুণদের ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি অনলাইনে সেবা নিতে পেরেছেন। ডিজিটালভাবে আবেদন করার পরও ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ নারী ও ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ তরুণকে সরকারি দফতরে গিয়ে কাগজপত্র জমা দিতে হয়েছে।

অন্য এক হিসাবে বলা হয়েছে, অনলাইনে আবেদন করার পর প্রায় ৩৭ শতাংশ নারী ও তরুণকে পরবর্তী ধাপে কাগজপত্র জমা দিতে এবং সরকারি দফতরে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নাগরিককে ফি পরিশোধ বা স্বাক্ষরের মতো কাজের জন্য আবার অফলাইন প্রক্রিয়ায় ফিরতে হয়েছে। ফলে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও নাগরিকের দফতরে যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

ই-গভর্ন্যান্সের পথে নাগরিকদের ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতিও বড় বাধা। গবেষণায় প্রায় অর্ধেক নাগরিকের ডিজিটাল সাক্ষরতায় ঘাটতি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অনেক পরিবারের সদস্যেরই মৌলিক কম্পিউটার ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রশিক্ষণ ও সচেতনতায় পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের নাগরিকরা অনলাইন সেবা গ্রহণে বেশি সমস্যায় পড়ছেন।

অঞ্চলভেদেও রয়েছে বড় বৈষম্য। ই-গভর্ন্যান্স প্রস্তুতিতে ময়মনসিংহ ও রাজশাহী তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও সবচেয়ে পিছিয়ে রংপুর। প্রস্তুতি সূচকে ময়মনসিংহের স্কোর ৫৭ দশমিক ৩ হলেও রংপুরের মাত্র ৮ দশমিক ৮। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দক্ষিণাঞ্চলের নারীরা ডিজিটাল প্রশিক্ষণ ও সচেতনতায় তুলনামূলক এগিয়ে। বিপরীতে উত্তরাঞ্চলের নারীরা পিছিয়ে রয়েছেন। ইউনিয়ন পর্যায়ের অফিসে কম্পিউটার ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ঘাটতি, তথ্য ফাঁসের ভয় ও ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি আস্থার অভাবও এর অন্যতম কারণ।

সরকারি দফতরগুলোর প্রস্তুতির চিত্রও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। স্থানীয় সরকার অফিসগুলোর সার্বিক ই-গভর্ন্যান্স প্রস্তুতি স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৩৮ দশমিক ৯। এর মধ্যে অবকাঠামোগত প্রস্তুতির স্কোর মাত্র ২৪ দশমিক ১। ইউনিয়ন কৃষি অফিসে গড়ে সচল কম্পিউটার রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৫টি, যার ৪৪ শতাংশই নষ্ট। বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প ব্যবস্থাও নেই অনেক দফতরে। ইউনিয়ন পরিষদের ৬৭ শতাংশ এবং ইউনিয়ন কৃষি অফিসের ৯৭ শতাংশ কার্যালয়ে আইপিএস বা জেনারেটর ব্যাকআপ নেই।

ডিজিটাল সেবায় ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও বড় উদ্বেগ রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সেবা নিতে গিয়ে ৫৮ শতাংশ নারী নিজেদের অনিরাপদ বোধ করেন এবং ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ নারী তথ্য ফাঁস বা হ্যাক হওয়ার আশঙ্কা করেন। ই-সেবা নেওয়ার পর ৬১ শতাংশ নারী ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। সেবা নেওয়ার সময় দেওয়া ফোন নম্বরে অনাকাক্সিক্ষত কল ও বার্তা পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতাও নাগরিক ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। সেবা পেতে সমস্যা, অতিরিক্ত টাকা দাবি বা অনিয়মের শিকার হলেও কোথায় এবং কীভাবে অভিযোগ করতে হবে, তা অনেকেই জানেন না। ফলে ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ নারী এবং ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ কখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি।

সংলাপে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, শুধু প্রযুক্তি যুক্ত করলেই কার্যকর ই-গভর্ন্যান্স হয় না। নাগরিকদের বারবার সরকারি অফিসে যেতে হলে সময় নষ্ট হয় এবং সেখানে হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ থাকে। নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী, সংখ্যালঘু, নিম্ন আয়ের পরিবার, দুর্গম এলাকার বাসিন্দা ও সীমিত শিক্ষার মানুষ যাতে বাদ না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলা ও স্থানীয় ভাষায় সেবা, কণ্ঠনির্ভর ও প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা এবং ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে সহায়তাপ্রাপ্ত সেবা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।

জবাবদিহি বাড়াতে স্থানীয় বাজেট, প্রকল্প ব্যয়, সুবিধাভোগীর তালিকা, সরকারি ক্রয় এবং সেবা দিতে কত সময় লাগবে- এসব তথ্য প্রকাশের সুপারিশ করেছে সিপিডি। অভিযোগ করা, অভিযোগের অগ্রগতি দেখা এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।

গবেষণায় প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন সদস্যকে সরকারি ই-সেবা ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে ‘ওয়ান ডিজিটাল মেম্বার পার হাউসহোল্ড’ কর্মসূচির সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আবেদন, যাচাই, ফি পরিশোধ, প্রক্রিয়াকরণ থেকে চূড়ান্ত সেবা পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে পর্যন্ত একটি সচল কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রতিটি স্থানীয় সরকারি দফতরে আইসিটি ফোকাল পয়েন্ট এবং শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সিপিডি আরও বলেছে, নাগরিককে কোন দফতর সেবা দেবে তা খুঁজে বের করার প্রয়োজন যেন না হয়- এমন ‘নো রং ডোর’ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সরকারি তথ্যভাণ্ডারগুলোর মধ্যে সমন্বয়, একক আবেদন- অবস্থা যাচাই ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট সেবার সময়সীমা ও ফি প্রকাশ এবং ই-গভর্ন্যান্সের কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য ডিজিটাল প্রস্তুতি সূচক চালুরও সুপারিশ করা হয়েছে।

সংলাপে বেসরকারি সংগঠন নাগরিকতা সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ডের ডেপুটি টিম লিডার ক্যাথরিনা কোনিগ বলেন, কেবল ডিজিটাল সেবা চালু করলেই সেটা নাগরিকবান্ধব হয় না। সেবা ব্যবহারে নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাধাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। নাগরিকের প্রয়োজন, মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সেবার নকশা ও উন্নয়ন করতে হবে। এ জন্য সরকার, নাগরিক সমাজ ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক সহযোগিতা জরুরি।

স্থানীয় সরকারের কতগুলো সেবা ডিজিটাল হয়েছে, সেটা নিয়ে তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সেবার পার্থক্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে সংলাপে উল্লেখ করেন সামাজিক উদ্যোক্তা ও আই সোশ্যালের চেয়ারপারসন অনন্য রায়হান। তিনি বলেন, একই সঙ্গে দুর্নীতি, হয়রানি ও অভিযোগ ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র জানতে পরিমাণগত জরিপের পাশাপাশি গুণগত গবেষণা দরকার।

সরকারি সেবার নকশা যাতে নাগরিকদের প্রয়োজন বুঝে করা হয়, সেই পরামর্শ দেন এসপায়ার টু ইনোভেটের (এটুআই) জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ফজলুল জাহিদ। তিনি বলেন, বিভিন্ন দফতরের তথ্য ও সেবাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় নিয়ে আসা জরুরি, যাতে নাগরিকদের বারবার একই তথ্য বা কাগজপত্র দিতে না হয়।

সরকারি আর্থিক খাতের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আমিনুল মোহাইমেন বলেন, সরকারি সেবার প্রকৃত চিত্র বুঝতে সুবিধাবঞ্চিত ও শহরের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেও গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। সেবার মান বাড়াতে কার্যকর অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট ও কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে হবে।

সময়ের আল/প্রিন্ট/টিকে


  বিষয়:   সেবা ডিজিটাল হলেও দৌড়াতে হয় দফতরে 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: