আজ বিশ্ব চিঠি দিবস

সময়ের আলো ডেস্ক

বিবিধ

সাদা, দুপুর রঙ, কখনোবা আবার রঙিন কাগজে লেখা হলো কিছু কথা। সেই শব্দমালায় প্রেম থাকে, প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের গল্প থাকে। কাগজটি ভাঁজ

2026-09-01T12:07:40+00:00
2026-09-01T12:10:38+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিবিধ
আজ বিশ্ব চিঠি দিবস
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৭ পিএম  আপডেট: ০১.০৯.২০২৬ ১২:১০ পিএম
ডাকবাক্স ও চিঠি। ছবি : সংগৃহীত
সাদা, দুপুর রঙ, কখনোবা আবার রঙিন কাগজে লেখা হলো কিছু কথা। সেই শব্দমালায় প্রেম থাকে, প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের গল্প থাকে। কাগজটি ভাঁজ করে ঢোকানো হলো হলুদ কিংবা বাদামি খামে। খামের ওপর লেখা হলো প্রেরক ও প্রাপকের নাম-ঠিকানা। তারপর সেটি যত্ন করে ফেলে দেওয়া হলো ডাকবাক্সে। শুরু হলো অপেক্ষা- চিঠি কবে পৌঁছাবে, কবে আসবে তার উত্তর?

একসময় এই অপেক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে থাকত অন্যরকম আনন্দ। ডাকপিয়নের হাতে প্রিয় মানুষের চিঠি দেখলেই মুখে ফুটে উঠত হাসি। কোনো চিঠিতে থাকত ভালোবাসা, কোনো চিঠিতে অভিমান। দূরে থাকা আপনজনের খবর, বন্ধুর কথা কিংবা জীবনের একেবারে সাধারণ কিছু কথাও হয়ে উঠত অমূল্য স্মৃতি।

আজকের দ্রুতগতির যোগাযোগব্যবস্থায় সেই দৃশ্য অনেকটাই অতীত। মুঠোফোনের এক স্পর্শেই মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বার্তা পৌঁছে যায়। তবু, হাতে লেখা চিঠির আবেদন পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং, তাৎক্ষণিক যোগাযোগের এই সময়ে চিঠি যেন আরও ব্যক্তিগত, আরও আবেগঘন এবং আরও দুর্লভ হয়ে উঠেছে।


প্রতি বছর ১ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় চিঠি দিবস। কাগজ-কলমে চিঠি লেখার অভ্যাসকে আবারও মানুষের জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই দিবসটির আয়োজন। ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার লেখক, আলোকচিত্রী ও শিল্পী রিচার্ড সিম্পকিন সিডনির ওয়েভারলি কলেজে বিশ্ব চিঠি দিবসের সূচনা করেন। চিঠি লেখার প্রতি তার ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকেই এই উদ্যোগের জন্ম।

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে সিম্পকিন অস্ট্রেলিয়ার যেসব মানুষকে তিনি কিংবদন্তি মনে করতেন, তাদের কাছে চিঠি লেখা শুরু করেন। তাদের অনেকের কাছ থেকেই তিনি উত্তর পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা পরে ২০০৫ সালে ‘অস্ট্রেলিয়ান লিজেন্ডস’ বইয়ে তুলে ধরেন তিনি। এরপর চিঠি লেখার আনন্দ আরও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বিশ্ব চিঠি দিবস শুরু করার উদ্যোগ নেন।

চিঠির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর ধীরগতি। এখন কেউ একটি বার্তা পাঠিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে উত্তর না পেলেই অস্থির হয়ে উঠতে পারেন। অথচ চিঠির সময়ে অপেক্ষা করাটাই ছিল যোগাযোগের স্বাভাবিক নিয়ম।

একটি চিঠি লেখার আগে মানুষকে ভাবতে হতো- কী লিখবেন, কোন কথাটি আগে বলবেন, কীভাবে নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ করবেন। এতে চিঠির প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে মিশে থাকত সময়, মনোযোগ ও আবেগ।


রিচার্ড সিম্পকিনের উদ্যোগের পেছনেও ছিল এই মনোযোগী লেখার অভ্যাস ফিরিয়ে আনার ভাবনা। তাৎক্ষণিক বার্তার মতো চিঠি লিখে সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া যায় না। নিজের কথাগুলো গুছিয়ে নিতে হয়, ভাবতে হয় প্রাপককে নিয়েও।

একসময় রাস্তার পাশে থাকা ছোট্ট ডাকবাক্সই ছিল দূরে থাকা মানুষের কাছে নিজের কথা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম। চিঠি সেখানে ফেলে দিয়ে অপেক্ষা করতে হতো ডাকপিয়নের।

যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮৫৮ সালে শহরের রাস্তায় চিঠি সংগ্রহের বাক্স স্থাপন শুরু হয়। এর ফলে প্রতিবার ডাকঘরে গিয়ে চিঠি জমা দেওয়ার প্রয়োজন থাকত না, রাস্তার সংগ্রহ বাক্সেই চিঠি ফেলে দেওয়া যেত। ডাকব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে দূরে থাকা মানুষের যোগাযোগও সহজ হতে থাকে। উনিশ শতকে ডাকের খরচ কমে আসা এবং ডাকব্যবস্থা আরও সহজলভ্য হওয়ায় বন্ধু, পরিবার ও পরিচিতদের সঙ্গে দূরত্ব পেরিয়ে যোগাযোগের সুযোগ বাড়ে।

বাংলার জীবনেও একসময় চিঠি ছিল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। বাড়ির সামনে ডাকপিয়ন এসে কারও নাম ধরে ডাকছেন- এই দৃশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপেক্ষা, আনন্দ, উৎকণ্ঠা ও কৌতূহল।

দূরে থাকা সন্তান বাবা-মাকে চিঠি লিখেছেন। স্বামী লিখেছেন স্ত্রীকে। বন্ধু লিখেছে বন্ধুকে। কেউ জানিয়েছে চাকরি পাওয়ার খবর, কেউ পরীক্ষার ফল। আবার কেউ লিখেছে বাড়ির অভাব-অভিযোগের কথা। 


চিঠি শুধু আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না। মুখোমুখি বলা সম্ভব হয়নি এমন অনেক কথাও জায়গা পেত চিঠির পাতায়। ভালোবাসা, অভিমান, অনুশোচনা, অপেক্ষা কিংবা মনের গোপন কথাগুলো কয়েকটি হাতে লেখা লাইনের মধ্যেই প্রকাশ করা যেত।

একটি চিঠির যেন নিজস্ব একটি শরীর আছে। কাগজের ভাঁজ, খামের ওপরের হাতের লেখা, কালির দাগ কিংবা ভুল করে কেটে দেওয়া কোনো শব্দ- সবকিছু মিলেই চিঠিটি অনন্য হয়ে উঠত।

আজকের একটি বার্তা হাজারো বার্তার ভিড়ে সহজেই হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বহু বছর আগের একটি চিঠি পুরনো বইয়ের ভাঁজে কিংবা কাঠের বাক্সে হঠাৎ পাওয়া গেলে, তা মুহূর্তেই ফিরিয়ে নিতে পারে কোনো নির্দিষ্ট সময়, মানুষ কিংবা সম্পর্কের কাছে।

চিঠির গুরুত্ব শুধু ব্যক্তিগত আবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও চিঠির পাতায় সংরক্ষিত হয়েছে। ব্যক্তিগত চিঠি, রাজনৈতিক চিঠিপত্র, যুদ্ধকালীন চিঠি কিংবা সাহিত্যিকদের পারস্পরিক যোগাযোগ- এসব অনেক সময় অতীতের মানুষ, সমাজ ও সময়কে বোঝার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে। ডাকব্যবস্থা শুধু মানুষের চিঠি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেয়নি; এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের সম্পর্ক বদলে যাওয়ার ইতিহাসেরও অংশ হয়ে আছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে চিঠি লেখার অভ্যাসও কমেছে। জরুরি খবরের জন্য মুঠোফোন, দীর্ঘ বার্তার জন্য নানা ধরনের মেসেজিং মাধ্যম ও অফিসের যোগাযোগে ই-মেইল- সবকিছুই এখন হাতের নাগালে। অপেক্ষার জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ। ডাকপিয়নের পায়ের শব্দের বদলে এখন মানুষ অপেক্ষা করে মুঠোফোনে আসা একটি বার্তার সংকেতের জন্য। তারপরও চিঠির আবেদন আলাদা। কারণ, একটি চিঠি লিখতে কাউকে সময় দিতে হয়। ব্যস্ততার মধ্যেও কিছুটা সময় আলাদা করে কাগজ-কলম হাতে বসতে হয়। হয়ত এই সময়টুকুই চিঠির সবচেয়ে বড় উপহার।

বিশ্ব চিঠি দিবসের মূল বার্তা প্রযুক্তিকে দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং দ্রুত যোগাযোগের এই সময়ে ধীর, ব্যক্তিগত ও অর্থবহ যোগাযোগের জায়গাটুকু ধরে রাখা। দিবসটির প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড সিম্পকিন এখনো বিদ্যালয়ে চিঠি লেখার কর্মশালা করেন। শিশু-কিশোর ও বড়দের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কিছুটা বিরতি নিয়ে কাউকে চিঠি লেখার জন্য উৎসাহ দেন।

আজ ডাকবাক্সের দিকে তাকালে হয়ত আগের মতো চিঠির স্তূপ দেখা যায় না। অনেক ডাকবাক্স অব্যবহৃত হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেও লুকিয়ে আছে এক সময়ের গল্প- কেউ লিখেছে, কেউ অপেক্ষা করেছে, কেউ উত্তর পেয়েছে। আবার কেউ উত্তর না পেলেও চিঠিটিকে যত্ন করে রেখে দিয়েছে।

মুঠোফোনের পর্দায় ‘ভালো থেকো’ লেখা যায় কয়েক সেকেন্ডে। কিন্তু কাগজে ‘ভালো থেকো’ লিখতে গেলে হাত থামে, মন ভাবে, শব্দ বেছে নিতে হয়। সেখানেই হাতে লেখা একটি চিঠি হয়ে ওঠে কয়েকটি শব্দের চেয়ে অনেক বেশি কিছু- একজন মানুষের আরেকজন মানুষের জন্য রেখে যাওয়া সময়, স্মৃতি ও ভালোবাসার ছোট্ট দলিল।

আজ একটি চিঠি লিখবেন?

বিশ্ব চিঠি দিবসে পুরনো ডাকবাক্সের কথা মনে করার পাশাপাশি একটি কাজ করা যায়- কাগজ-কলম হাতে নিয়ে এমন কাউকে চিঠি লেখা, যাকে অনেক দিন কিছু বলা হয়নি। কারণ, সব যোগাযোগ দ্রুত হতে হয় না। কিছু কথা একটু দেরিতে পৌঁছালেই হয়ত তার মূল্য আরও বেড়ে যায়। হয়ত আপনার লেখা কয়েকটি লাইন কারও কাছে হয়ে উঠতে পারে এমন একটি স্মৃতি, যা বহু বছর পরও সে যত্ন করে রেখে দেবে।

সময়ের আলো/মহু



  বিষয়:   চিঠি  দিবস  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: