আমরা মানুষ বড়ই আত্মঅহমিকা বোধসম্পন্ন প্রাণী। আমরা নিজেদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গর্ববোধ করি। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা নিয়ে অহংকার করি। মহাকাশে উপগ্রহ পাঠিয়ে ভাবি পৃথিবীকে বুঝি নিজের মুঠোর ভেতর বন্দি করে ফেলেছি।
অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে পাহাড়ের চূড়া কেটে রাস্তা বানাই। পৃথিবীর প্রতিকূলতাকে জয় করার মাধ্যমে অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস মানুষকে প্রতিদিন মেকি অহমিকার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসের মিথ্যা অহমিকার ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে এক নির্মম সত্য। সেই সত্য প্রকাশিত হয় প্রকৃতি যখন তার নিজের শক্তির প্রকাশ ঘটায়, তখন মানুষের সব মিথ্যা অহংবোধ মুহূর্তের মধ্যে তুচ্ছ হয়ে যায়। তখন বোঝা যায়, মানুষ যত বড় সভ্যতাই নির্মাণ করুক না কেন, প্রকৃতির সামনে সে এখনও এক অসহায় শিশু মাত্র।
প্রকৃতি কখনো হঠাৎ করে প্রতিশোধ নেয় না; বরং বারবার সতর্ক করে। কখনো নদীর অস্বাভাবিক ভাঙনে, কখনো অতিবৃষ্টি ও খরায়, কখনো তাপপ্রবাহে আবার কখনো মৃদু ভূমিকম্পনে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে পরপর কয়েকবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। অধিকাংশ ভূমিকম্প বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়নি। কিন্তু তাই বলে নিশ্চিন্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং এই ছোট ছোট কম্পন যেন প্রকৃতির নীরব চিঠি যেখানে লেখা আছে, ‘প্রস্তুত হও, সময় খুব বেশি নেই।’ প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই চিঠি পড়ছি? নাকি প্রতিবারের মতো কয়েক ঘণ্টা আলোচনা করে আবার সব ভুলে যাচ্ছি?
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের পাশাপাশি ভূমিকম্পের ঝুঁকিও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনো স্থানের ভূকম্পনের জন্য ফল্ট লাইন এবং টেকনিক স্ট্রেস ফিল্ড গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। সাধারণত বড় ধরনের ভূকম্পন হয়ে থাকে প্লেট বাউন্ডারির মধ্যে। যদিও বাংলাদেশ প্লেট বাউন্ডারির মধ্যে নয়, তথাপি ভূপ্রাকৃতিক অবস্থান ও বিন্যাসের স্বকীয়তায় বাংলাদেশ ভূমিকম্প সক্রিয় অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত।
বাংলাদেশকে ভূকম্পনের তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জোন হিসেবে উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু কিছু স্থান যেমন- সিলেট, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার উল্লেখযোগ্য। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট, ময়মনসিংহ এবং রংপুর, ঢাকা, কুমিল্লা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিছু অংশ। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের চারটি জেলায় বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। একইভাবে ময়মনসিংহ বিভাগের পাঁচটি জেলাও ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নরসিংদী জেলার অংশ বিশেষ, পুরো কিশোরগঞ্জ জেলা এবং কুমিল্লা বিভাগের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে আছে- খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলার উত্তরাংশ।
মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের অংশবিশেষ, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলা। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, বড় মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঘটলে বাংলাদেশ বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা এখনও দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি।
একটি বড় ভূমিকম্পে শুধু ভবন ধসে পড়াই একমাত্র সমস্যা নয়। এর পরপরই শুরু হতে পারে আরও ভয়াবহ এক মানবিক সংকট। শহরের সরু রাস্তা ধ্বংসস্তূপে আটকে যাবে, অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারবে না।
বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে গিয়ে অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়বে। গ্যাসলাইন ফেটে বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হবে। পানির পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগুন নেভানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাবে না। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ ভূমিকম্পের মূল আঘাতের পর শুরু হবে আরেকটি নীরব বিপর্যয়।
ঢাকা মহানগরীর আবাসিক এলাকার বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। অধিকাংশ এলাকায় পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত খোলা জায়গা, সংকীর্ণ গলি, ভবনের সঙ্গে ভবনের বিপজ্জনক নৈকট্য এবং অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। কোথাও কোথাও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করাই সম্ভব নয়। আবার অনেক ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো অকার্যকর কিংবা কখনো ব্যবহারই করা হয়নি। ভূমিকম্পের পরে যদি একযোগে শত শত স্থানে আগুন লাগে, তা হলে সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমাদের অনেক ভবনই যথাযথ প্রকৌশল নকশা ও নির্মাণবিধি অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। কোথাও অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত তলা যোগ করা হয়েছে, কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। আবার পুরোনো বহু ভবনের ভূমিকম্প সহনশীলতা কখনো পরীক্ষা করা হয়নি।
ফলে বড় ধরনের কম্পনে এসব ভবন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শুধু অবকাঠামো নয়, সামাজিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও আমাদের ঘাটতি প্রকট। অধিকাংশ মানুষ জানে না ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে কিংবা কীভাবে নিজের পরিবারকে নিরাপদ রাখতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, বিপণিবিতান ও আবাসিক এলাকায় নিয়মিত মহড়া এখনও ব্যতিক্রমী ঘটনা। অথচ জাপান, নিউজিল্যান্ড বা চিলির মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোতে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই দুর্যোগ মোকাবিলার শিক্ষা দেওয়া হয়। ফলে বড় দুর্যোগেও মানুষের প্রাণহানি তুলনামূলকভাবে কম হয়।
ভূমিকম্প প্রতিরোধ করার ক্ষমতা মানুষের নেই, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার সক্ষমতা অবশ্যই আছে। এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতা। প্রথমত সব নতুন ভবনকে অবশ্যই ভূমিকম্প সহনশীল নকশা অনুযায়ী নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবনের তালিকা করে ধাপে ধাপে সংস্কার অথবা অপসারণ করতে হবে। তৃতীয়ত আবাসিক এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি পানির সংরক্ষণ এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত নগর পরিকল্পনায় পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে দুর্যোগের সময় মানুষ নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর, ওয়াসা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা অপরিহার্য। ভূমিকম্পের পর কোন এলাকায় কীভাবে উদ্ধার অভিযান চলবে, কোথায় অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র হবে, কীভাবে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হবে এবং কীভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা হবে- এসব বিষয়ে আগাম মহড়া ও প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। পাঠ্যবইয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাস্তব অনুশীলনের অভাব রয়েছে। বছরে অন্তত কয়েকবার ভূমিকম্প মহড়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। একইভাবে সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিল্প-কারখানা ও আবাসিক কমপ্লেক্সেও নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া চালু হওয়া উচিত। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আতঙ্ক নয়, তথ্যভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
ভূমিকম্পের সময় লিফট ব্যবহার না করা, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ পরিকল্পনা তৈরি করা এসব সাধারণ বিষয়ও হাজারো প্রাণ রক্ষা করতে পারে। আমাদের উন্নয়নের আলোচনায় প্রায়ই উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল, সেতু কিংবা বহুতল ভবনের কথা উঠে আসে। কিন্তু একটি বড় ভূমিকম্পে যদি সেই উন্নয়নের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়, তা হলে অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতির পরিমাণ হবে কল্পনাতীত। তাই উন্নয়নকে শুধু দৃশ্যমান অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিরাপদ ও টেকসই নগর গঠনের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রকৃতি আমাদের বিরুদ্ধে নয়। প্রকৃতি শুধু তার নিজস্ব নিয়মে চলে। সমস্যা হলো, আমরা সেই নিয়মকে উপেক্ষা করি। নদী ভরাট করি, জলাধার নষ্ট করি, পাহাড় কাটি, অপরিকল্পিতভাবে শহর গড়ে তুলি এবং নির্মাণবিধিকে অবহেলা করি। তারপর যখন প্রকৃতি তার স্বাভাবিক শক্তির প্রকাশ ঘটায়, তখন আমরা তাকে দুর্যোগ বলে অভিহিত করি। প্রকৃতপক্ষে অনেক দুর্যোগই মানুষের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ফল।
সম্প্রতি অনুভূত ভূমিকম্পগুলো হয়তো বড় কোনো বিপর্যয় ঘটায়নি। কিন্তু এগুলো আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তাকে যদি আমরা গুরুত্ব না দিই, তা হলে ভবিষ্যতে, ইতিহাস হয়তো আমাদের ক্ষমা করবে না। দুর্যোগের পরে শোক প্রকাশের চেয়ে দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নেওয়া অনেক বেশি মানবিক, অনেক বেশি দায়িত্বশীল।
প্রকৃতির নীরব চিঠি বারবার আমাদের দরজায় এসে পৌঁছাচ্ছে। সেই চিঠিতে আতঙ্ক নয়, দায়িত্ববোধের আহ্বান লেখা আছে। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের- আমরা কি সেই চিঠি পড়ে নিজেদের প্রস্তুত করব, নাকি অবহেলার স্তূপে ফেলে রেখে একদিন ভয়াবহ মূল্য দেব? সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু সময় যে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, সেটিও প্রকৃতি তার নীরব ভাষায় আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/আআ