জলাতঙ্ক মানেই একসময় ছিল কুকুরের কামড়। কিন্তু সেই ধারণা এখন বদলে গেছে। বর্তমানে জলাতঙ্কের সবচেয়ে বেশি বিস্তার ঘটছে বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে। বৃহৎ পরিবার ভেঙে ছোট ছোট পরিবারে রূপান্তর, খেলাধুলার সুযোগের সীমাবদ্ধতা, সেই সঙ্গে একাকিত্বসহ নানবিধ কারণে শহুরে মানুষের মধ্যে যেমন বাড়ছে বিড়ালপ্রেমীর সংখ্যা তেমনি সচেতনতার অভাবে বাড়ছে জলাতঙ্কের বিস্তার।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের তথ্য বলছে, অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন নিতে আসা রোগীদের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছর র্যাবিস ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন গড়ে সোয়া লাখ জন। আর গড়ে মৃত্যু হচ্ছে ৫৩ জনের। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কর্তৃক পোষা পাখি ও প্রাণী উদ্ধারের পরিসংখ্যান বলছে কয়েক বছর ধরে দেশে বিশেষ করে রাজধানীবাসীর মধ্যে পাখি ও বিড়াল পোষার প্রবণতা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরে বিড়ালের দ্বারা আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। হাসপাতালটিতে ২০২২ সালে কুকুর, বিড়াল, বেজি, বানর ও শিয়ালের আক্রমণে আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮৯ হাজার ৯২৮ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯৪ হাজার ৩৮০ জন, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জন। বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে হয় ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জন এবং ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে এখানে র্যাবিস ভ্যাকসিন নিয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫১ জন।
এই হাসপাতালের তথ্যমতে, ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছর মার্চ মাস পর্যন্ত জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যু হয়েছে ১৭৮ জনের। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন, ২০২৫ সালে ৫৯ জন এবং ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ১৯ জন রোগী মারা গেছেন।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, ২০১৫ সালে দেশে জলাতঙ্কে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালে ৬৬ জন, ২০১৭ সালে ৮০ জন, ২০১৮ সালে ৫৭ জন, ২০১৯ সালে ৫৭ জন, ২০২০ সালে ২৬ জন, ২০২১ সালে ৪০ জন এবং ২০২২ সালে ৪৫ জনের মৃত্যু হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়-আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক মানুষ এখানে অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন নিতে আসেন; যাদের ৮০ শতাংশই বিড়ালের দ্বারা আক্রান্ত। আবার এসব বিড়ালে অধিকাংশ পোষা বিড়াল। আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক শিশু। এ ছাড়া কুকুর, বানর, বেজি দ্বারা আক্রান্তরাও ভ্যাকসিন নিতে আসেন।
গত তিন দিন সরেজমিন ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ৯ থেকে ৫০ ঊর্ধ্ব বয়সি অনেকেই টিকা নিতে আসছেন। যাত্রাবাড়ী থেকে আসা সামিয়া নামে একটি শিশু ও তার অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পোষা বিড়াল সামিয়াকে পায়ে কামড় দিয়েছে। তবে সামিয়া জানায় তারপরও সে বিড়াল পুষবে। বিড়ালটাকে সে খুব ভালোবাসে।
তার অভিভাবকরাও বলেন, কোনোভাবেই সামিয়াকে বিড়াল পোষা থেকে বিরত রাখা যায় না। বিড়ালটি তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী।
ঢামেক হাসপাতালের টিকাকেন্দ্রে দায়িত্বরত একজন নার্স জানান, এখন যারা আসছেন, তাদের বড় অংশই বাসার পোষা বিড়ালের দ্বারা আক্রান্ত। অনেকেই শখ করে এখন বিড়াল পালন করছেন, কিন্তু টিকা দেওয়ার বিষয়ে অনেকেই উদাসীন। গত ৩-৪ বছরে বিড়ালের দ্বারা আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে তিনি জানান।
জানা যায়, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যান। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের মৃত্যু হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, কামড়ের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে সাধারণত ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগে। কখনো কখনো এক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্তও লাগতে পারে। লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। তবে কামড় বা আঁচড়ের পরপরই ক্ষতস্থান সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে দ্রুত ভ্যাকসিন নিলে এই রোগ শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন অনেক মানুষ টিকা নিতে আসেন। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিড়াল দ্বারা আক্রান্ত। বাকিরা কুকুর দ্বারা। তিনি বলেন, জলাতঙ্ক প্রাণঘাতী। এতে মৃত্যু অনিবার্য। সে জন্য কুকুর-বিড়ালে কামড় বা আঁচড় দিলে যত দ্রুত সম্ভব টিকা দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বিড়াল, কুকুর, বেজি ও শিয়ালের কামড় থেকে জলাতঙ্ক ছড়ায়। সচেতনতার অভাবে অনেকে সামান্য আঁচড় বা কামড় মনে করে প্রতিষেধক নিতে আসেন না। ফলে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান অনেকে। অথচ সময়মতো প্রতিষেধক টিকা নিলে সহজে প্রাণঘাতী এই রোগ থেকে বাঁচা সম্ভব।
এদিকে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরে পোষা প্রাণী বিশেষ করে বিড়াল উদ্ধারের জন্য তাদের কাছে অনেক ফোন আসছে। যদিও পোষা প্রাণী উদ্ধার করা ফায়ার সার্ভিসের কাজ না কিন্তু তারপরও অনেক সময় এসব উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসকে যেতে হয়।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে তারা ৫৫৫টি পোষা পাখি ও প্রাণী উদ্ধার করে। ২০২৪ সালে ৫৮০টি, ২০২৩ সালে ৩৪৭টি এবং ২০২২ সালে উদ্ধার করে ৫৩০টি পোষা পাখি ও প্রাণী।
ফায়ার সার্ভিসের অতিরিক্ত সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) শাজাহান বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পোষা প্রাণী বিশেষ করে বিড়াল উদ্ধারের জন্য অনেক ফোন কল আসে ফায়ার সার্ভিসের কাছে। এসব ফোন থেকে আন্দাজ করা যায়, অনেকেই এখন পশু-পাখি পালন করছেন।
সামাজিক-অর্থনৈতিকসহ নানবিধ কারণে বিড়াল পালনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করেন সমাজ বিশেষজ্ঞরা।
সমাজ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বিড়াল পালনের পেছনে আছে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ। করোনা-পরবর্তী সময়ে শহুরে মানুষের মধ্যে একাকিত্ব বেড়েছে, আর সেই শূন্যতা পূরণে অনেকেই বেছে নিয়েছেন পোষা প্রাণী। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বিড়াল পোষা সহজ— কম জায়গায় রাখা যায়, তুলনামূলক কম খরচ এবং কম ঝামেলা। ফলে শহরের প্রায় ৯০ শতাংশ পোষা প্রাণীর মালিকই বিড়াল পোষেন।
জানা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পোষা বিড়াল আছে যুক্তরাষ্ট্রে। সংখ্যাটা ৭ কোটি ৪২ লাখের বেশি। দ্বিতীয় স্থানে আছে চীন, সেখানে পোষা বিড়াল আছে প্রায় ৫ কোটি ৩১ লাখ। আর তৃতীয় স্থানে আছে রাশিয়া। সেখানে প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ পোষা বিড়াল আছে। তবে বাংলাদেশে কত সংখ্যক পোষা বিড়াল আছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। প্রতি বছর ৮ আগস্ট পালন করা হয় বিশ্ব বিড়াল দিবস।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি